ওয়েছ খছরু: সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট সিটি করপোরেশন ফের এসেছে আলোচনায়। এখন নগরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এ প্রতিষ্ঠানটি। গত তিন দিন ধরে নগর ভবনের তিন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঝুলছে তালা। কাজেও মন্থরগতি।
মেয়র নেই সিলেট সিটি করপোরেশনে। আরিফুল হক চৌধুরী কারাবন্দি হওয়ার পর সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। আইনি জটিলতায় প্যানেল মেয়রও দায়িত্ব নেননি। ফলে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাই এখন সব। তিনি মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছেন আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা। চলছে ভালোই।
কিন্তু হঠাৎ করে মাঝপথে এসে থমকে গেলো সিলেট সিটি করপোরেশন। আওয়ামীপন্থি কাউন্সিলররা ক্ষুব্ধ হয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে তালা দিয়েছেন। এরপর থেকে চার দিন ধরে অনেকটা থমকে দাঁড়িয়েছে করপোরেশনের কর্মকাণ্ড।
এরই মধ্যে নানা আলোচনায় উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন। কেউ বলছেন- এই দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে হকার মার্কেট ভাঙ্গার দরপত্র আহ্বান, আবার কেউ বলছেন- অর্থমন্ত্রী বরাদ্দ করা ২২ কোটি টাকার কাজের পরিকল্পনা আলোচনাক্রমে না হওয়ার কারণেই এই বিরোধ। এই দুটির কোনো একটি কারণেই নতুন দ্বন্দ্ব বেঁধেছে।
আর এই দ্বন্দ্বের কারণেই সাম্প্রতিক অচলাবস্থা সিলেট সিটি করপোরেশনে। কাউন্সিলররাও দ্বিধা-বিভক্ত। দুই পক্ষের মধ্যে একপক্ষ তালা মারার পক্ষে ও অপর পক্ষ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
আওয়ামীপন্থি কাউন্সিলররা জানিয়েছেন, সরকার ক্ষমতায় থাকলেও তারা সিলেট সিটি করপোরেশনে প্রভাব বিস্তার করার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এমনকি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবারিত স্বাধীনতা দিয়ে কাজ করার ক্ষেত্র দেয়া হয়েছে। তাদের একটা লক্ষ্য-মেয়রবিহীন সিলেট সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেন থমকে না যায়।
তারা দাবি করেছেন- বর্তমান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিব অনেকটা একজন মেয়রের মতো কাজ করছেন। তার কাছে সরকার দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তাদের মতে, ঘটনার শুরু সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ২২ কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে।
ওই টাকাটা অর্থমন্ত্রী সিলেট সদর উপজেলায় দিতে চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগপন্থি কাউন্সিলররা অনেকটা দেন দরবার করে ওই টাকা সিলেট সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য নিয়ে আসেন। অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দুই দফায় ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
টাকা বরাদ্দের পর খোদ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাই মত প্রকাশ করেছিলেন, ওই টাকার ৭০-৮০ ভাগ কাজ আওয়ামীপন্থি কাউন্সিলরদের দেয়া হবে। কিন্তু আওয়ামীপন্থি কাউন্সিলররা সেটি না মেনে বলেন- কোনো দলীয় নয়, ২৭টি ওয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ এক সঙ্গে চালাতে প্রকল্প নেয়া হোক। এ কারণে সব কাউন্সিলর তাদের প্রস্তাবনাও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের প্রস্তাবনার তোয়াক্কা না করে সিটি কর্মকর্তারা ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ প্রকল্পগুলো ওই প্রস্তাবনায় চূড়ান্ত করেন।
আর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে বাদ দেয়া হয়। এ নিয়ে শুধু আওয়ামীপন্থিই নয় সিনিয়র কাউন্সিলররাও ক্ষুব্ধ হন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো কার্য তালিকায় নিয়ে আসার জন্য বার বার অনুরোধ জানালেও তাদের কথায় কেউ কান দেয়নি। অবশেষে তালা দেয়া হয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের সিনিয়র কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান, আজাদুর রহমান আজাদসহ ১৩ জন কাউন্সিলর তালা দিয়ে প্রশ্ন তুলেন, প্রতি মাসে কোটেশনের জন্য অর্ধকোটি টাকা উত্তোলন করা হয়।
কিন্তু ওই টাকায় কী কাজ হয় সে ব্যাপারে স্বচ্ছতা আনতে হবে। পাশাপাশি টেন্ডার প্রক্রিয়ায়ও অস্বচ্ছতা রয়েছে। উন্নয়ন কাজের টেন্ডার কর্মকর্তারা আহ্বান করতে পারেন কী না- সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তারা।
তবে কাউন্সিলরদের অপর অংশটি প্রকাশ্য কর্মকর্তাদের পক্ষে অবস্থান না নিলেও কৌশলে তারা আওয়ামীপন্থি কাউন্সিলরদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, ২২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি কাজ পেয়েছেন আওয়ামীপন্থি কাউন্সিলররা। উন্নয়ন প্রকল্প নয়, সিলেটের হকার মার্কেট ভাঙ্গার প্রকল্প নিয়ে চলমান সংকট দেখা দিয়েছে।
আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন লাল দিঘীরপাড় সিটি মার্কেট ভাঙার দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সে সময় মার্কেটের ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়। উচ্চ আদালতে রিটের শুনানি রায় সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষে আসে।
এরপর সরকারদলীয় কিছু কাউন্সিলর সমঝোতার মাধ্যমে ১ কোটি ৫ লাখ টাকায় এই কাজ নিতে চান। আর তাদের এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তিন কর্মকর্তার কক্ষে তালা দেয়া হয়েছে।
এদিকে, তিন কর্মকর্তার কক্ষে তালা দেয়ার পরপরই সিলেট আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। সিলেট জেলা পরিষদে বৈঠকে আন্দোলরত কাউন্সিলররা ওই তিন কার্যালয়ের চাবি জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের নিকট হস্তান্তর করেন। তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওই তিন কর্মকর্তাকে কার্যালয়ে আসতে নিষেধ করার অনুরোধ করেন। নেতারা এ ব্যাপারে আগামী ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত সময় চান। এ সময় তারা সিলেট সিটি করপোরেশনের ওই তিন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত সময় নিয়েছেন।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতামত গ্রহণ করবেন বলে জানান। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান, সাধারণ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. লুৎফর রহমান, সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগর সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমদ, কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান, আমজাদ হোসেন আবজাদ, ইলিয়াছুর রহমান, শান্তনু দত্ত সন্তু, সিকন্দর আলী, সাইফুল আমিন বাকের, রকিবুল ইসলাম ঝলক, তৌফিক বক্স লিপন প্রমুখ।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিবও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর বিষয়টি সুরাহা হবে। তবে, তারা কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান।