নাম প্রকাশে অপারগ/অনিচ্ছুক একজন:
এই সময়রোদটা বেশ হেলে পড়েছে। কাঁধের গামছাটা দিয়ে ভালো করে কপালের ঘামটা মুছে নিল কলিমুদ্দি। আষাঢ় মাস; অথচ আকাশে ছিটেফোঁটা মেঘও নেই। এই রিকশা, যাবেন? রিনরিনে কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকাল কলিমুদ্দি। দুটি মেয়ে—একজন সাদা সালোয়ার-কামিজ পরা, অন্যজন নীল। কই যাইবেন? নতুন বাজার। দূর-দূরান্ত রেস্তোরাঁয়। উঠেন। কত দিব? দিয়েন। সব সময় যা দেন। পনেরো টাকা দিব। কম হইয়া যায় গো, মা। জ্যাম ঠেইলা যাওন লাগব। পঁচিশটা টাকা দিয়েন। কিসের পঁচিশ টাকা। পনেরো টাকা দিয়ে রেগুলার যাই। না, যামু না। মেয়ে দুটি এগিয়ে গেল। কলিমুদ্দির শরীরটা ভালো না। গা-টাও কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। বাড়িতে ছোট মেয়েটারও জ্বর। ওষুধ নিতে হবে। না হলে আজ আর বের হতো না সে। মেয়েগুলো মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশা নেই। নীল জামা ব্যস্তভাবে ঘড়ি দেখছে। কলিমুদ্দি এগিয়ে গেল।
উঠেন। বিশ টাকা দিয়েন।
মেয়ে দুটো চোখাচোখি করল। তারপর উঠে বসল।
কলিমুদ্দি প্যাডেল মারতে শুরু করল। শরীরে আর আগের মতো জোর নেই। বয়স এখন পঞ্চান্ন। রোগ-শোক শরীরে ঘর বাঁধবে, এটাই স্বাভাবিক।
এই দীপা…আমার না কেমন যেন লাগছে।
রিকশার ডান পাশ থেকে একজন বলল।
দূর! শোন, এত এক্সাইটেড হয়ে পড়িস না। আগে দ্যাখ ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়। ভালো কথা, তুই তাকে চিনবি কী করে?
সাবিত তো বলেছে, নীল শার্ট পরে আসবে।
আচ্ছা! এই জন্য তুইও নীল জামা পরেছিস!
শোন, ফাজলামো করবি না।
কী জানি করে ছেলেটা?
কতবার বলব তোকে, ব্যাংকে চাকরি করে।
থাকে তো গাজীপুর, তাই না?
হুঁ।
গ্রামের বাড়ি কই রে?
আশ্চর্য। গ্রামের বাড়ি কোথায়, আমি কী করে বলব?
এই সময় বাব্বা! ছয় মাস মোবাইল ফোনে প্রেম করলি, কথা বলতে বলতে রাতের পর রাত পার করে দিলি; অথচ তার সম্পর্কে কিছুই জানিস না। কিছুক্ষণ দুজনই চুপচাপ। কলিমুদ্দির খুব ক্লান্ত লাগছিল। ছোট মেয়েটার জ্বর। দুশ্চিন্তাও হচ্ছিল। তুই কি ছেলেটার সঙ্গে পাকাপাকি রিলেশন করবি? যদি সে রকম ছেলে হয়। আর আকাশের কী হবে? ধেৎ! ওটা তো ছিল টাইম পাস। রিকশা মাঝেমধ্যে জ্যামে পড়ছে, আবার চলছে। এই ছোট্ট শহরেও জ্যাম লাগে। চাচা, বাঁয়ে একটু রাখেন। কলিমুদ্দি থামল। সাদা জামা নেমে পড়ল। যাই রে। এই দীপা…শোন। তুই প্লিজ আমার সঙ্গে আয় না। মাথা খারাপ। আমার টিউশনি আছে না। তুই যা। কী সমস্যা? কিন্তু…।
আরে বাবা, যা না।
আচ্ছা…। বাই।
বাই।
কলিমুদ্দি আবার চলতে শুরু করল। পেছনে খুব সুন্দর একটা রিংটোন বেজে উঠল। মেয়েটা বেশ সময় নিয়ে ফোন ধরল।
হ্যালো…রাশেদ। আমি তো রাস্তায়…লিপিদের বাসায় যাচ্ছি…একটা নোট আনতে হবে…আজ কী করে দেখা করব…আজ পারব না…খুব বিজি…না…না তো…কালকে মাস্ট দেখা করব…হ্যাঁ…ঠিক আছে…আচ্ছা…রাখি…বাই।
রেস্তোরাঁ এসে গেছে। বেশ সাইড করে রিকশাটা দাঁড় করাল কলিমুদ্দি। ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে নীল জামা ঢুকে গেল ভেতরে। কলিমুদ্দিরও বেশ খিদে পেয়েছে। ফুটপাতের ছোট চায়ের দোকানটায় ঢুকল সে। কী খাবে ভাবছে। চায়ের সঙ্গে কী খাওয়া যায়? বিস্কুট, নাকি পাউরুটি।
দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কলিমুদ্দি সেই রেস্তোরাঁর সামনেই আছে। জ্বর-জ্বর লাগছে। মনমতো প্যাসেঞ্জারও পায়নি।
রেস্তোরাঁর কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল নীল জামা। সঙ্গে নীল শার্ট পরা একটা ছেলে। ছেলেটা মেয়েটাকে একটা রিকশা করে দিল। মেয়েটা চলেও গেল। নীল শার্ট এদিক-ওদিক তাকাল। একটা সিগারেট ধরাল। কতক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। তারপর এগিয়ে এল কলিমুদ্দির দিকে।
এই, বাসস্ট্যান্ড। কত?
তিরিশ টাকা।
ছেলেটা দ্বিরুক্তি না করে উঠে বসল।
কলিমুদ্দির খুব কষ্ট হচ্ছে। সে প্যাডেল মারতে থাকল।
ছেলেটার ফোন এসেছে।
হ্যালো…আমিও…কই তুই?
ছেলেটা কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে।
হুঁ…দেখা হয়েছে…আরে না…মোটামুটি…নীরার সামনে দাঁড়াতেই পারবে না…না না…আরে ধেৎ…প্রশ্নই আসে না…আমি…আমি আজই আসছি…এই অমিত…তুই ফোন কাট…মিতু ফোন দিচ্ছে…আচ্ছা…হ্যাঁ…রাখি।
হ্যাঁ…মিতু…ময়না…কেমন আছ তুমি? আমি তো অফিস থেকে বের হলাম…বাসায় যাচ্ছি…তোমার জন্য…।
কলিমুদ্দি কেমন হাঁপিয়ে গেছে। জ্বরটা বোধ হয় বেড়েছে। ধীর পায়ে সে প্যাডেল মারতে থাকে।
রাস্তার দৈর্ঘ্য কি বেড়ে যাচ্ছে?
Leave a Reply