মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:৫৪

‘ইনহাস্ত ওয়াতানাম’- এইতো আমার জন্মভূমি!

‘ইনহাস্ত ওয়াতানাম’- এইতো আমার জন্মভূমি!

আকবর হোসেন / ৮২
প্রকাশ কাল: বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২১

‘ইনহাস্ত ওয়াতানাম’ অর্থাৎ এইতো আমার জন্মভূমি – আব্দুর রহমান । তার লম্বা আকৃতি, গায়ের রঙ ফর্সা। সে ‘হরফন মৌলা’ বা সকল কাজের কাজী। আঙ্গুলগুলো দু’কাঁদি মর্তমান কলা হয়ে যেনো ঝুলছে। পা দুখানা ডিঙি নৌকার সাইজ। কাঁধ দেখে মনে হলো আমার বাবুর্চি আব্দুর রহমান না হয়ে সে যদি আমির আব্দুর রহমান হতো, তবে অনায়াসে গোটা আফগানিস্তাদের ভার বইতে পারতো। তার ছিল বিশাল বপু। আফগানিস্তান গরিব দেশ, ইতিহাস গড়ার জন্য মাটি ভাঙবার ফুরসৎ আফগানের নেই। মাটি যদি নিতান্তই খুঁড়ে তবে সে কাবুলী মহেঞ্জোদারো বের করার জন্য নয়-কয়লার খনি পাবার আশায়। বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক, ভ্রমণ কাহিনীর রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থে এভাবেই আব্দুর রহমান এবং আফগানিস্তানের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সেই আফগানিস্তানে বিশ বছর পর আবারো তালেবান ফিরে এলো। তাই এই ঘটনায় দেশে বিদেশে গ্রন্থের অন্যতম চরিত্র আব্দুর রহমানের কথা মনে পরে গেলো।

সুদীর্ঘ বিশ বছরে প্রাণহানির পরিমান প্রায় আড়াই লাখ। ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অনেক। এতোকিছুর পরও সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি, শান্তি ফিরে আসেনি। বিশ্ব শান্তির তথাকথিত ‘সোল এজেন্টরা’ বিশ্বকে কোনো চমক দেখাতে পারেননি। পৃথিবী হয়ে উঠেছে আরো সংঘাতময়, আরো বিপর্যস্ত। বিন লাদেনকে ধরতে আমেরিকা সহ মিত্র দেশগুলো আফগানিস্তানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজ বিন লাদেন নেই, সাদ্দামও নেই, গাদ্দাফিও নেই, কিন্তু যুদ্ধবাজরা ঠিকই আছে, উধাও হয়েছে শুধু শান্তি। বিশ্বকে ধোঁকা দিয়ে মুখের জোরে টোনি ব্লেয়ার বলেছিলেন, সাদ্দামহীন বিশ্ব নাকি হবে আরো শান্তিময়! কিন্তু কই? শান্তির পায়রা আজ কোন বনে যেন হারিয়ে গেছে। বুশ-ব্লেয়ার এর কী জবাব দেবেন?

তালেবানরা বিনা রক্তপাতে উদ্ধার করলো পুরো দেশ। তথাকথিত বড়ো বড়ো পরাশক্তিগুলো যেন নিমিষেই পরাজিত হলো। তা’ কী করে সম্ভব! অনেকেরই সেটা বুঝে আসছেনা। দখলদার বাহিনীর সহযোগীসহ সুযোগ সন্ধানীদের ভিড়ে কাবু হলো কাবুল এয়ারপোর্ট। তালেবানের ভয়ে পালাতে চাচ্ছে তারা। কিন্তু তালেবান বলছে ভিন্ন কথা। তারা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। তাদের কাছে সবাই নিরাপদ, যদিও কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছে। বিশ্ব মিডিয়ায় তালেবানের কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে। নারী অধিকার, শিক্ষা, সরকার গঠন ইত্যাদি নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক, নানা জল্পনা কল্পনা। সারা বিশ্বে আলোচনা-সমালোনার ঝড় বইছে।

সম্প্রতি তালেবানের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া দুই বাঙালি তমাল ভট্টাচার্য ও স্বরজিৎ মুখোপাধ্যায় কলকাতা এয়ারপোর্টে গণমাধ্যমে বলেন, ‘তালেবানরা প্রথমে এসেই আমাদের বললো স্যার চিন্তা করবেন না; আমরা আপনাদের কিছুই করবো না। আপনাদের আমরা হেফাজত করবো (ওস্তাদ আপ ফিকার মাত কারো হাম কুচ নেহি কারেঙ্গে হাম আপকি হেফাজত কারেঙ্গে)।’ ‘তিনি (তালেবান নেতা) আমাদের নিশ্চিত করেছেন যে আমরা যেন কোনো চিন্তা না করি। তিনি বলেছেন যে আমরা ৯০ দশকের তালেবানদের মতো না। তিনি চাইছেন বর্তমানে একটা নতুন দেশ তৈরি করতে।’

ইভোন রিডলী, একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক, তিনি প্যালেস্টাইনের পক্ষের একজন ক্যাম্পাইনার এবং ওয়ার অন টেরর ও ফরেন পলিসির একজন জোরালো সমালোচক। ২০০১ সালে তিনি আফগানিস্তানে প্রবেশ করলে তালেবানরা তাকে অপহরণ করে। তাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি তালেবানদের ভূয়শী প্রশংসা করেন। তালেবানরা তার সাথে ভালো ব্যবহার করে বলে তিনি জানান। তিনি তাদের আতিথেয়তায় যারপর নাই মুগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইভোন ‘ইন দা হ্যান্ডস অব দা তালিবান’ বই লিখে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সে সময়ে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছিলো। ইভোন রিডলী বলেন, যখন তিনি বন্দী অবস্থায় ছিলেন, তখন তালেবানরা তার প্রতি শ্রদ্ধার আচরণ করে এবং পরবর্তীতে তাদের সৌজন্যতা দেখে তিনি বিস্মিত হন। তিনি যে সমস্ত পুরুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন তারা তাদের দৃষ্টি (তার দিকে) নামিয়ে রাখে, যা তাকে হতবাক করে।

বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্রকার মাইকেল মুরের ফারেনহাইট ৯/১১ ছবিটি ২০০৪ সালে নির্মিত হয়. এতে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনাবলী, ইরাক যুদ্ধ, বিন লাদেন এর পরিবার ও সৌদি সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ের কঠোর সমালোচনা করা হয়। টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী ঘটনার কোনো পাবলিক ইনকোয়ারি হয়নি, যেমন হয়নি লন্ডনে ৭/৭ বোমা হামলার। ৯/১১ এর পেছনের কাহিনী হয়তো কোনো দিনও জানা যাবেনা। যেভাবে টুইন টাওয়ার ধ্বংস হলো, সন্ত্রাসীরা যে কায়দায় দুঃসাহসিক হামলা চালালো তার জের ধরেই বিন লাদেনকে ধরতে আমেরিকা আফগানিস্তানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাথে যোগ দেয় ব্রিটিশ বাহিনী ও ন্যাটো। কিন্তু পরিণতিতে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ছাড়া কিছুই অর্জিত হয়নি। মার্কিনিরা কী এখান থেকে কোনো শিক্ষা নেবে, তা এখনো জানা না গেলেও সময়ই বলে দেবে।

গণতন্ত্ৰ আর মানবাধিকার শুধু পাশ্চাত্যের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে একনায়কতন্ত্র থাকলে তাদের জন্য ভালো, তাই তারা কথা বলে না। আরব বসন্ত তাই তাদের কাছে ভালো লাগে না। মুখে যত সবকই দেয়া হোকনা কেনো কার্যত বিপরীত দেখা যায় মুসলিম দেশগুলোর বেলায়। একেই বলে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, প্যালেস্টাইন, ইয়েমেনে কত রক্ত ঝরছে তার কি কোনো হিসেব আছে? এ সব রক্তের কী কোনো দাম নেই? মুসলমানরা কী মানুষ না? যারা মানবতার বুলি আওড়ান তারা তো জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জানমালের নিরাপত্তার কথাই বলবেন।

তালেবানরা একসময় আমেরিকানদের মিত্র ছিল। সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে তালেবানদের অস্ত্রশস্ত্ৰ দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। তখন তারা সন্ত্রাসী ছিল না। বুঝে আসেনা নিজের জন্মভূমিকে দখলদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করতে যারা জীবন বাজি রেখে লড়াই করে তারা সন্ত্রাসী হয় কেমনে! আর যারা তাদেরকে সহযোগিতা করলো আজ তাদের নিরাপত্তাকে কতইনা প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে! আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা দেবে কে? কাবুল এয়ারপোর্টের দৃশ্য কিসের ইঙ্গিত দেয়? যারা দেশ ছেড়ে পালাতে প্লেনের দিকে পঙ্গপালের মতো ছুটছে তাদের কাছে কী আমাদের সৈয়দ মুজতবা আলীর আব্দুর রহমানের খবর পৌঁছেনি? সে পানসিরকে ভীষণ ভালোবাসতো। তারা কি জামাল উদ্দিন আফগানীর মতো জাতীয় বীরদের কথা ভুলে গেছে? যে আফগানিস্তানে কোনো পরাশক্তি টিকে থাকতে পারেনি, সে মাটিইতো তাদের জন্মভূমি।

সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেন, “বহুদিন ধরে সাবান ছিল না বলে আবদুর রহমানের পাগড়ী ময়লা। কিন্তু আমার মনে হল চতুর্দিকের বরফের চেয়ে শুভ্রতর আবদুর রহমানের পাগড়ী, আর শুভ্রতম আবদুর রহমানের হৃদয়!” সে নাকি লেখকের সাথে শেষদিন পর্যন্ত কার্পেটের দিকে তাকিয়েই কথা বলেছে। স্বভাব চরিত্রে এতোই বিনয়ী ছিলো আব্দুর রহমান। আমরা আফগানিস্তানে সেই শুভ্রতম হৃদয়ের আব্দুর রহমানের আগমনের প্রত্যাশায় রইলাম। তালেবানরা কী সেই নয়া আফগানিস্তান উপহার দিতে পারবে? যার প্রত্যয় তারা ইতোমধ্যেই ব্যক্ত করেছে!

লেখক: বিলেত প্রবাসী সাংবাদিক। ইমেইল- akbargermany92@gmail.com




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2021