মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:১০

সূরা আল ইসরা

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ১৭১
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২২

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয়সূরা আল ইসরা শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেনইসলাম বিভাগ প্রধান ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান

নামকরণ
চার নম্বর আয়াতের অংশ বিশেষ থেকে বনী ইসরাঈল নাম গৃহীত হয়েছে। বনী ইসরাঈল এই সূরার আলোচ্য বিষয় নয় । বরং এ নামটিও কুরআনের অধিকাংশ সূরার মতো প্রতীক হিসেবেই রাখা হয়েছে।

নাযিলের সময় কাল প্রথম আয়াতটিই একথা ব্যক্ত করে দেয় যে, মি’রাজের সময় এ সূরাটি নাযিল হয় । হাদীস ও সীরাতের অধিকাংশ কিতাবের বর্ণনা অনুসারে হিজরাতের এক বছর আগে মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল । তাই এ সূরাটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় অবস্থানের শেষ যুগে অবতীর্ণ সূরাগুলোর অন্তরভুক্ত।

পটভূমি
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহীদের আওয়াজ বুলন্দ করার পর তখন ১২ বছর অতীত হয়ে গিয়েছিল । তাঁর পথ রুখে দেবার জন্য তাঁর বিরোধীরা সব রকমের চেষ্টা করে দেখছিল । তাতে সকল প্রকার বাধা বিপত্তির দেয়াল টপকে তাঁর আওয়াজ আরবের সমস্ত এলাকায় পৌঁছে গিয়েছিল । আরবের এমন কোন গোত্র ছিল না যার দু’চারজন লোক তাঁর দাওয়াতে প্রভাবিত হয়নি।

মক্কাতেই আন্তরিকতা সম্পন্ন লোকদের এমন একটি ছোট্ট দল তৈরী হয়ে গিয়েছিল যারা এ সত্যের দাওয়াতের সাফল্যের জন্য প্রত্যেকটি বিপদ ও বাধা বিপত্তির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল । মদীনায় শক্তিশালী আওস ও কাযরাজ গোত্র দু’টির বিপুল সংখ্যক লোক তার সমর্থকে পরিণত হয়েছিল এখন তাঁর মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরিত হয়ে বিক্ষিপ্ত মুসলমানদেরকে এক জায়গায় একত্র করে ইসলামের মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সময় ঘনিয়ে এসেছিল এবং অতিশীঘ্রই তিনি এ সুযোগ লাভ করতে যাচ্ছিলেন।

এহেন অবস্থায় মি’রাজ সংঘটিত হয় । মি’রাজ থেকে ফেরার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়াবাসীকে এ পয়গাম শুনান।

বিষয়বস্তু ও আলোচ্য বিষয়
এ সূরায় সতর্ক করা, বুঝানো ও শিক্ষা দেয়া এ তিনটি কাজই একটি আনুপাতিক হারে একত্র করে দেয়া হয়েছে। সতর্ক করা হয়েছে মক্কা কাফেরদেরকে । তাদেরকে বলা হয়েছে, বনী ইসরাঈল ও অন্য জাতিদের পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। আল্লাহর দেয়া যে অবকাশ খতম হবার সময় কাছে এসে গেছে তা শেষ হবার আগেই নিজেদেরকে সামলে নাও।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরআনের মাধ্যমে যে দাওয়াত পেশ করা হচ্ছে তা গ্রহণ করো। অন্যথায় তোমাদের ধ্বংস করে দেয়া হবে এবং তোমাদের জায়গায় অন্য লোকদেরকে দুনিয়ায় আবাদ করা হবে।

তাছাড়া হিজরাতের পর যে বনী ইসরাঈলের উদ্দেশ্যে শীঘ্রই অহী নাযিল হতে যাচ্ছিল পরোক্ষভাবে তাদেরকে এভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রথমে যে শাস্তি তোমরা পেয়েছো তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো এবং এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের পর তোমরা যে সুযোগ পাচ্ছো তার সদ্ব্যবহার করো । এ শেষ সুযোগটিও যদি তোমরা হারিয়ে ফেলো এবং এরপর নিজেদের পূর্বতন কর্মনীতির পুনরাবৃত্তি করো তাহলে ভয়াবহ পরিণামের সম্মুখীন হবে।

মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য এবং কল্যাণ ও অকল্যাণের ভিত্তি আসলে কোন কোন জিনিসের ওপর রাখা হয়েছে, তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী পদ্ধতিতে বুঝানো হয়েছে। তাওহীদ, পরকাল, নবুওয়াত ও কুরআনের সত্যতার প্রমাণ পেশ করা হয়েছে।

মক্কার কাফেরদের পক্ষ থেকে এ মৌলিক সত্যগুলোর ব্যাপারে যেসব সন্দেহ – সংশয় পেশ করা হচ্ছিল সেগুলো দূর করা হয়েছে। দলীল – প্রমাণ পেশ করার সাথে সাথে মাঝে মাঝে অস্বীকারকারীদের অজ্ঞতার জন্য তাদেরকে ধমকানো ও ভয় দেখানো হয়েছে।

শিক্ষা দেবার পর্যায়ে নৈতিকতা ও সভ্যতা – সংস্কৃতির এমনসব বড় বড় মূলনীতির বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলোর ওপর জীবনের সমগ্র ব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের প্রধান্য লক্ষ্য। এটিকে ইসলামের ঘোষণাপত্র বলা যেতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক বছর আগে আরববাসীদের সামনে এটি পেশ করা হয়েছিল।

এতে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, এটি একটি নীল নকশা এবং এ নীল নকশার ভিত্তিতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের দেশের মানুষের এবং তারপর সমগ্র বিশ্ববাসীর জীবন গড়ে তুলতে চান।এসব কথার সাথে সাথেই আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হেদায়াত করা হয়েছে যে, সমস্যা ও সংকটের প্রবল ঘূর্ণবর্তে মুজবুতভাবে নিজের অবস্থানের ওপর টিকে থাকো এবং কুফরীর সাথে আপোশ করার চিন্তাই মাথায় এনো না।

তাছাড়া মুসলমানরা যাদের মন কখনো কখনো কাফেরদের জুলুম, নিপীড়ন, কূটতর্ক এবং লাগাতার মিথ্যাচার ও মিথ্যা দোষারোপের ফলে বিরক্তিতে ভরে উঠতো, তাদেরকে ধৈর্য ও নিশ্চিন্ততার সাথে অবস্থার মোকাবিলা করতে থাকার এবং প্রচার ও সংশোধনের কাজে নিজেদের আবেগ – অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উপদেশ দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে আত্মসংশোধন ও আতসংযমের জন্য তাদেরকে নামাযের ব্যবস্থাপত্র দেয়া যেসব উন্নত গুণাবলীতে বিভূষিত হওয়া উচিত তেমনি ধরনের গুণাবলীতে ভূষিত করবে। হাদীস থেকে জানা যায়, এ প্রথম পাঁচ ওয়াক্ত নামায মুসলমানদের ওপর নিয়মিতভাবে ফরয করা হয়।কোরআন মাজীদের ১৭ নং সূরার নাম সূরা ইসরা বা সূরা বনী ইসরাঈল। এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ সূরাগুলোর অন্যতম। এই সূরায় ১১১টি আয়াত এবং ১২টি রুকু এবং এই সূরায় মোট অক্ষর সংখ্যা ৬৯৯৩। এই সূরার সংখ্যাতাত্তি¡ক উপাত্তগুলোর একক নিম্নরূপ।

যথা:
ক. সূরাটির ক্রমিক নং ১৭; (১+৭)=৮
খ. সূরাটির আয়াত সংখ্যা ১১১; (১+১+১)=৩
গ. এই সূরার রুকু সংখ্যা ১২; (১+২)=৩
ঘ. সূরাটির অক্ষর সংখ্যা ৬৯৯৩; (৬+৯+৯+৩)=২৭
(২+৭)=৯
সবগুলোর যোগফল ২৩। তার একক (২+৩) = ৫। এ ৫ সংখ্যাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কেননা লক্ষ করলে দেখা যায়, আরবী মিরাজ শব্দে ৫টি বর্ণই আছে এবং তা ৫টি পর্বে বিন্যস্ত। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা মিরাজের প্রথম পর্ব ‘ইসরা’ সম্পর্কে আলোকপাত করতে প্রয়াস পাবো।

মহান রাব্বুল আলামীন মিরাজের প্রথম পর্ব ‘ইসরা’-এর স্বরূপ, হাকিকত ও মাহিয়াত বিশ্লেষণসহ সূরা বনী ইসরাঈলের ১নং আয়াতে ইরশাদ করেছেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রজনী যোগে মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শনাবলি দেখানোর জন্য, তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’
এই আয়াতে কারিমার বাচনভঙ্গি খুবই প্রাণস্পর্শী ও চমৎকার।

কেননা এই আয়াতে কারিমায় আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত প্রথমে তৃতীয় ও পরে উত্তম পুরুষ নিজের জন্য ব্যবহার করেছেন। আরবী অলঙ্কারশাস্ত্র অনুসারে পরস্পর সংলগ্ন দু’টি বাক্যে একই কর্তার উত্তম ও তৃতীয় পুরুষের ব্যবহার ব্যাকরণসম্মত ব্যাপার।

এর একটি উদাহরণ আমরা নিম্নল্লিখিত আয়াতে কারিমায় খুঁজে পাই। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্য হতে দ্বাদশ নেতা নিযুক্ত করেছিলাম, আর আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, তোমরা যদি সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও, আমার রাসূলগণে ঈমান আনো ও তাদেরকে সম্মান করো এবং আল্লাহকে ঋণ প্রদান করো, তবে তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করব এবং নিশ্চয়ই তোমাদেরকে জান্নাতে দাখিল করব, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; এরপরও কেউ কুফরি করলে সে সরল পথ হারাবে।’ (সূরা মায়িদাহ : আয়াত ১২)।

আরবী ‘ইসরা’ শব্দের অর্থ হলো রজনী যোগে ভ্রমণ করা। সূরা বনী ইসরাঈলের ১নং আয়াতে ‘আসরা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, আল্লাহপাক বলেন, ‘আমি আমার বান্দাহকে রজনী যোগে ভ্রমণ করিয়েদিলাম’

মিরাজ যে রাতে সংঘটিত ও সম্পন্ন হয়েছিল এই আয়াত দ্বারা তা সুস্পষ্ট হয়েছে এবং মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে ‘ইসরা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। সহি বুখারী শরীফ ও সহি মুসলিম শরীফসহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে মিরাজের প্রথম পর্ব ‘ইসরা’-এর বিবরণ রয়েছে।

সংক্ষেপে ঘটনাটি এরূপ, ‘পিয়ারা নবী মুহাম্মদ মোস্তফা সা. আবু তালিবের গিরিসঙ্কটে (শিয়াবে আবি তালিব) উম্মে হানীর বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। আকস্মাৎ তার গৃহের ছাদ খুলে গেল। হযরত জিব্রাঈল আ.সহ তিনজন ফেরেশতা তার নিকট আগমন করলেন এবং তাকে কাবা শরীফের প্রাঙ্গণ হাতিমে নিয়ে গেলেন। প্রথমে তিনি মুহাম্মদ সা.-এর সিনা মোবারক চাক করলেন।

তারপর তা জমজমের পানি দ্বারা ধৌত করলেন। তারপর ঈমান ও হেকমতপূর্ণ সোনার একটি তস্তুরি আনা হলো এবং তাকে সিনা মোবারকে সংস্থাপন করা হলো। এরপর গর্দভ হতে বড় এবং খচ্চর হতে ছোট সাদা রং-এর একটি লম্বা জানোয়ার ‘বোরাক’ আনা হলো। যার দ্রুতগামিতার হাল ছিল এই যে, চোখের দৃষ্টির প্রান্তসীমায় তা পড়তে ছিল। যখন তিনি বোরাকের ওপর আরোহণ করতে ইচ্ছা করলেন, তখন তা নর্তন-কুর্দন শুরু করে দিলো।

হযরত জিব্রাঈল আ. জিজ্ঞেস করলেন, এমন করছো কেন? তোমার পিঠে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সা. হতে অধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত ও মর্যাদাশীল কেউ আরোহণ করেননি। এ কথা শুনে বোরাক ঘর্মাক্ত হয়ে গেল। পিয়ারা নবী মুহাম্মদ সা. বোরাকের ওপর আরোহণ করে বায়তুল মুকাদ্দাস গমন করলেন এবং বোরাকটিকে সেই কড়ার সঙ্গে বাঁধলেন, যেখানে অন্য আম্বিয়াগণ নিজেদের সওয়ারি বেঁধে রাখতেন। পথিমধ্যে আল্লাহপাকের কুদরতের বহু নিদর্শন প্রত্যক্ষ করলেন।

তারপর মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করে সেখানে সমবেত আম্বিয়ায়ে কেরামের ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। মসজিদ হতে বের হওয়ার পর হযরত জিব্রাঈল আ. শরাব এবং দুধের দু’টি পেয়ালা তার সামনে পেশ করলেন। তিনি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করলেন।

হযরত জিব্রাঈল আ. বললেন, আপনি ফিতরাত ও সহজাত স্বভাবকে পছন্দ করেছেন। যদি শরাবের পেয়ালা গ্রহণ করতেন, তাহলে আপনার উম্মত গোমরাহ হয়ে যেত। তারপর হযরত জিব্রাঈল আ. তাকে নিয়ে প্রথম আকাশের দিকে ঊর্ধ্বলোকে রওনা হলেন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2022