বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:০৪

জিলু খুন নিয়ে নতুন বাঁকে সিলেট বিএনপির রাজনীতি

জিলু খুন নিয়ে নতুন বাঁকে সিলেট বিএনপির রাজনীতি

ওয়েছ খছরু: মহানগর ছাত্রদল নেতা জিল্লুল হক জিলুর খুনের ঘটনায় নতুন বাঁক নিতে শুরু করেছে সিলেট বিএনপি। ঘটনায় পক্ষ-বিপক্ষে প্রকাশ্যে নেতাদের অবস্থান নেয়া নিয়ে তোলপাড় চলছে। দল গোছানো কিংবা সরকারবিরোধী আন্দোলনের চেয়ে বিএনপি নেতারা এ খুনের ঘটনার পর নিজেরাই নিজেদের ঘায়েলের প্রক্রিয়া বেশি তৎপর হতে শুরু করেছেন। খুনের পরপরই ঘটনায় অংশ নেয়া ঘাতকদের চেয়ে তাদের গডফাদারদের নিয়ে আলোচনা বেশি। একই সঙ্গে খুনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা ও নেতাকর্মীর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সিলেটে চলমান আন্দোলনে থাকা ফ্রন্টলাইনের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। এ অবস্থায় খলনায়কের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হয়েছেন কেউ কেউ।

ইলিয়াস আলী গুমের পর থেকে কোন চেন অব কমান্ড নেই সিলেট বিএনপিতে। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সব বলয় এক কাতারে এসে দাঁড়ালেও নির্বাচনের পরপরই আবার যে যার অবস্থানে ফিরে যান। সিটি নির্বাচনের পর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী দলীয় ঐক্য ধরে রাখতে কোন প্রচেষ্টা চালাননি। বরং তিনি ওই সময়ের পর রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে রয়েছেন। মাঝখানে শমসের মবিন চৌধুরী সিলেটে বিএনপির রাজনীতিকে সাজানোর প্রক্রিয়া চালিয়েছিলেন।

কিন্তু গত উপজেলা নির্বাচনে কয়েকটি সিদ্ধান্তের কারণে তিনি বিতর্কিত হওয়ায় এরপর থেকে নীরব রয়েছেন। এ অবস্থায় গত ২৭শে জুন মদিনা মার্কেটে নিজ দলের ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন ছাত্রদল নেতা জিল্লুল হক জিলু। তিনি সিলেটের ছাত্রদলের মীরাবাজার গ্রুপের নেতা হওয়ায় ঘটনার পর থেকে জিলু খুনের ঘটনা নিয়ে আন্দোলনে রয়েছেন ওই গ্রুপের নেতারা। আর পুলিশ ঘটনার পরপরই যে দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছিল তাদের একজনের স্বীকারোক্তি মতো জেনেছিল, জিলুকে হত্যার পরিকল্পনার জন্য খাসদবির ও পাঠানটুলা এলাকার দু’টি বাসায় বৈঠক হয়। ওই সব বৈঠকে মীরবক্সটুলা গ্রুপের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জিলু খুনের পর সিলেটে কেবল মীরাবাজার গ্রুপ ছাড়া সব অংশেরই ছিল মুখ বন্ধ।

কিন্তু যখন জিলুর পরিবার থেকে বিএনপি নেতা মাহবুব কাদির শাহীকে ওই মামলায় আসামি করা হয় তখন থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলের অপর অংশের নেতারা মুখ খুলতে শুরু করেন। তারা খুনের ঘটনার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি বিএনপি নেতা শাহীকে আসামি ও তার বাসায় হামলার নিন্দা জানান। এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়েছেন শমসের মবিন চৌধুরী। কিন্তু তার বিবৃতি সম্পর্কে তিনি নিজেই কিছু জানেন না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

এম এ হকের স্বাক্ষরে দেয়া ওই বিবৃতি নিয়ে সিলেটে তোলপাড় চলছে। একই সঙ্গে খুনের ঘটনার চার দিন পর মহানগর বিএনপি ও ছাত্রদল এ নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবদুল আহাদ খান জামাল জানিয়েছেন, জিলু খুনের ঘটনায় আমরা শোকাহত। দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে হারিয়ে আমরা হতবাক। আর এ অবস্থায় জিলুর খুনের ঘটনাকে আড়াল করতে একটি মহল নানা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে জিলুর খুনিদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনে থাকা নেতাদের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, সিলেটে খুন করে পরে এ ঘটনা নিয়ে রাজনীতি করা নতুন নয়। এ রাজনীতির হোতা সব সময় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চায়।

এমএ হক স্বাক্ষরিত শমসের মবিন চৌধুরী নিন্দা ও প্রতিবাদ: সিলেট মহানগর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুল কাদির শাহীর বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে ভাঙচুর ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়ে একটি পত্র পাঠানো হয়েছে গণমাধ্যমে। এতে বলা হয়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরী বীরবিক্রম ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, আমি ছাত্রদলকর্মী জিল্লুল হক জিলু প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি ইতিমধ্যে করেছি। বিভিন্ন পত্রিকায় নিহত জিল্লুল হক জিলুর সঙ্গে থাকা তার সহকর্মী ভুলন কান্তি তালুকদার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জিল্লুল হক জিলুকে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের নাম বলেছেন। এখানে মহানগর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুল কাদির শাহীর কোন নাম নেই। এখানে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিভিন্ন পত্রিকায় ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নাম এসেছে সেখানে ও মাহবুবুল কাদির শাহীর কোন নাম নেই। সুতরাং মাহবুবুল কাদির শাহীর বাড়িতে আক্রমণ করে ভাঙচুর ও তার গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি তাকে মামলার আসামি করায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের বিবৃতি: সিলেট মহানগরের সভাপতি জিয়াউল গণি আরেফিন জিল্লুর, জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওমর আশরাফ ইমন ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাফেক মাহবুব এক যৌথ বিবৃতিতে জিল্লুল হক জিলুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। পাশাপাশি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত খুনিদের সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে বিচারের আহ্বান জানান।

নেতারা বলেন, ঘটনার পর থেকে অতি-উৎসাহিত একটি মহলের অপতৎপরতায় জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যেমে যেভাবে বিএনপি এবং ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র নেতাদের নামে যে অপপ্রচার চালিয়ে দায়বার চাপানোর অপচেষ্টা করছে একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল, এ থেকে প্রতীয়মান হয়, আসল হত্যাকারীদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশে থাকতে পারে। কোন লাশ নিয়ে রাজনীতি হোক সেটা আমরা আশা করি না। আমাদের সহকর্মী জিল্লুল হক জিলুর লাশ নিয়ে যারা নোংরা রাজনীতি করছে তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক। প্রশাসনকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি। ঘটনার পরপরই সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি ও মহানগর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুল কাদির শাহীর বাসভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া এবং বিভিন্ন বাসাবাড়িতে লুটপাটে যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তার করলে আসল অপরাধীদের নাম বেরিয়ে আসবে।

দোয়া ও মিলাদ মাহফিল: এদিকে জিলুর আত্মার মাগফিরাত কামনায় ছাত্রদল ও ইলিয়াসমুক্তি ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে গতকাল বাদ জোহর দরগাহ মাজার মসজিদে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক এমরান আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি ও ইলিয়াসমুক্তি ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল আহাদ খান জামাল, সিলেট জেলা জাসাসের আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন, মহানগর ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক মতিউল বারী চৌধুরী খোরশেদ, বিএনপি নেতা মুফতি নেহাল, জেলা ছাত্রদলের সহ-প্রচার সম্পাদক আজিজুল হোসেন আজিজ প্রমুখ।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026