বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:২০

অপরাধ নেই, তবু ওরা কারাগারে

অপরাধ নেই, তবু ওরা কারাগারে

গাজী ফিরোজ: ছয় বছরের আবদুর রহমান। পরনে ডোরাকাটা শার্ট ও জিনসের প্যান্ট। কেমন আছ, প্রশ্ন করতেই বলল, ভালো নেই। গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাতাম। এখানে কোনো বন্ধু নেই। বই নিয়ে স্কুলে যেতে ইচ্ছা হয়। কিছু ভালো লাগে না। মায়ের সঙ্গে বন্দী আবদুর রহমানের সঙ্গে ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারা কার্যালয়ে কথা হয়।

চোখে-মুখে রাজ্যের বিষণ্নতা। মায়ের অপরাধে কেন তাকেও শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরে সে। রহমানের মতো ফারুক, আখতার, লাইলি, খুরশিদা ও মতুর্জাও বহুদিন মাঠে দৌড়ে বেড়ায় না। দেখে না খোলা আকাশ। কেন্দ্রীয় কারাগারে এমন ৪২ জন শিশু বন্দী রয়েছে। তাদের জন্য নেই কোনো ডে কেয়ার সেন্টার। লেখাপড়া, খেলাধুলা, চলাফেরা ও মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। বেসরকারি সংস্থা অপরাজেয় বাংলা এই শিশুদের জন্য কিছু খেলনা সরবরাহ করেছে। কিন্তু তাতে কি মন ভরে? শুনুন রহমানের কথা, ‘কিছু খেলনা আছে, কিন্তু এগুলো নিয়ে খেলতে ইচ্ছে করে না। মাঠে দৌড়াইতে ইচ্ছা করে।’

ঈদ চলে গেল, অথচ কোথাও বেড়াতে বের হতে পারেনি বন্দী শিশুরা। কয়েকজন আক্ষেপ করে বলছিল, সালামি (টাকা) পায়নি। ঈদে মামার বাড়ি, খালার বাড়ি বেড়াতে যাওয়া হয়নি। আর সব শিশুর মতো ঘোরা হয়নি পার্কেও।
কারাগারে আটক ওই সব শিশুর কোনো অপরাধ নেই। তাদের বিরুদ্ধে নেই কোনো মামলা। মায়ের অপরাধের কারণেই এসব শিশুকে বন্দী থাকতে হচ্ছে দিনের পর দিন। কারাগারের নারী ওয়ার্ডে এই শিশুরা মায়ের সঙ্গেই থাকে। নারী কারারক্ষীদের তত্ত্বাবধানে দিনে একবার ওয়ার্ডের এক পাশে খেলাধুলার সুযোগ মেলে। বন্দীদের জন্য বরাদ্দ খাবার খেতে হয় তাদের।

এ ছাড়া সপ্তাহের পাঁচ দিন অপারাজেয় বাংলাদেশের দুজন শিক্ষক তাদের বর্ণপরিচয়ের শিক্ষা দেন। কারাগারে একাধিক সন্তান নিয়ে আছেন বেশ কয়েকজন নারী বন্দী। সন্তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত তাঁরা। ৪২ জন শিশুর মধ্যে পাঁচ শিশুই জমিলা খাতুন নামের রোহিঙ্গা এক হাজতির। দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে চার মেয়ে ও এক শিশুপুত্র নিয়ে কারাগারে আছেন এক বছর ধরে। তিন কন্যাশিশু নিয়ে তাহেরা বেগম নামের আরেক নারী আছেন ছয় মাস ধরে। জমিলা জানান, বিদেশি নাগরিক–সম্পর্কিত আইনে তাঁকে আটক করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। তাঁর শিশুদের দেখার মতো তার কেউ নেই। তিনি জামিনে মুক্তি পেলে শিশুরা মুক্ত বাতাসে ফিরে আসবে।
কারাগারে মায়েদের সঙ্গে শিশুরা

কারাগারে মায়েদের সঙ্গে শিশুরা৪২ জন শিশুর মধ্যে অনেকের জন্মই হয়েছে কারাগারে। মুক্ত পৃথিবীর আলো-বাতাস এখনো গায়ে লাগেনি তাদের। জেসমিন আক্তার নামের যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক নারী চার মাস আগে মারিয়া নামের এক কন্যাশিশুর জন্ম দেন। সাজাপ্রাপ্ত আসামি রুনার সন্তান রহিমেরও জন্ম হয়েছে কারাগারে। কারাগারে চিৎকার, চেচামেচি ও গালাগাল শুনেই বড় হচ্ছে এসব শিশু।

তবে শিশুদের বন্দিজীবনে একটু হলেও ঈদের আমেজ এসেছে নগরের কয়েকজন বিত্তবানের কল্যাণে। কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁরা নতুন জামা উপহার দিয়েছেন শিশুদের। জামা মিললেও সালামি না পাওয়ায় মন খারাপ সবার। বাঁশখালীর ছয় বছরের মরতুজা বলে, বাড়িতে ঈদের সময় মা-বাবাসহ পরিবারের বড়দের কাছ থেকে সালামি পেতাম। এখানে সালামি কে দেবে! তবে সালামি না মিললেও ভালো খাবারের আয়োজন ছিল। কারা

কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদের দিন সকালে সেমাই, দুপুর ও রাতে মাছ–মাংস খেয়েছে শিশুরা। চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. ছগির মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বন্দী মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে কারাগারে। ডে কেয়ার সেন্টার তৈরির প্রস্তাব পাঠানো হলেও তা আটকে আছে। তিনি আরও জানান, কারাবিধি অনুযায়ী বন্দী মায়েদের সঙ্গে চার বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা কারাগারে থাকতে পারে। এরপর কারা তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর বয়সের শিশুদের রাখার নিয়ম আছে। এর বেশি বয়সের শিশুদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় শিশু পরিবারে। তবে কারাগারে বেশ কিছু শিশুর বয়স ইতিমধ্যে পাঁচ অতিক্রম করেছে।

শিশুদের কথা বিবেচনা করে অসহায় নারী বন্দীদের আইনি সহায়তা দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। এ কাজে এগিয়ে এসেছে জাতীয় আইনগত সহায়তা কমিটি। এ ছাড়া বন্দী শিশুদের সেবা দিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশ। সংস্থার চট্টগ্রামের প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহাবুবুল আলম বলেন, কারাগারে থাকা শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা ও বিনোদনসুবিধা দিতে এগিয়ে এসেছি আমরা। এতে কিছুটা হলেও শিশুদের কষ্ট লাঘব হচ্ছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2025