সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ : প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ অর্জন এবং লন্ডনে অভিনন্দিত সংক্ষিপ্ত যাত্রা বিরতি সফলই বলা যায়। এবারের বিশ্ব পরিমন্ডলে শেখ হাসিনার অর্জন অনেক ব্যাপক এবং কূটনীতির রাজ্যে সফলতার মাপকাঠিতে বিস্তর ব্যাখ্যা রাখে। সেটা বলাই বাহুল্য।
যদি না দেশের অভ্যন্তরে দুই বিদেশী আকস্মিক হত্যা না হতো- তাহলে এবারের এই দুই অর্জন শেখ হাসিনার কূটনৈতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের চাঞ্চল্য পশ্চিমা জগত সহ পূর্ব ইউরোপে নিয়ে আসতে পারতো। কেননা শেখ হাসিনা তার পশ্চিমা কূটনীতিতে সমঝোতা ও আর দক্ষতার চালে যিনি কমান্ডেবল এক ভুমিকা রেখে চলেছেন, তিনি হলেন শেখ হাসিনার চালে সমানভাবে দ্যুতিয়ালি করতে অভ্যস্থ ও হাসিনা ডাইন্যাস্টির বহির্বিশ্বের উজ্জ্বলতায় সমৃদ্ধ এক নাম- জাতি সংঘের আজকের দুত,বোস্টন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সাবেক এই অধ্যাপক।
দেশের ভিতরের দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকান্ড শেখ হাসিনার জাতিসংঘ আর লন্ডনের সম্বর্ধনা খানিকটা ম্লান করে দিয়ে অনেকটাই ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে সরকারের ভিতরে ও বাহিরে। সরকার বহু কষ্টে বোস্টনের এই অধ্যাপককে জাতি সংঘে নিয়ে এসে বিগত পাচ-ছয় বছরে যে কষ্ট করে ভাব মূর্তি গড়ে তুলেছিলো- দেশের ভিতরে ইটালিয়ান নাগরিকের হত্যাকান্ডে সেই ইমেজের মধ্যে পুরোটা না হলেও খানিকটা তিথে ঢেলে দিয়েছে।যে কারণে শেখ হাসিনা চান তার বৈদেশিক মন্ত্রক নতুন করে ঢেলে সাজাতে- এমন এক দক্ষ ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দিতে চান, যার রয়েছে বিগত সব চাইতে সংকটকালিন সময়ে শেখ হাসিনার সরকারের জন্য উজ্জ্বল ভাব-মূর্তি উদ্ধার ও প্রতিষ্ঠায় এক ট্র্যাক রেকর্ডের অধিকারি।
শুধু ট্র্যাক রেকর্ড নয়, মার্কিনী ও ইউরোপ সহ মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতীয় লবিষ্টদের কাছে সকল দিক থেকেই গ্রহণযোগ্যতা। এমনকি মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে দ্যুতিয়ালি করে ইউরোপীয়দের ঢাকা সফর পিছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন, তারানকোর অফিসের সাথে রয়েছে সুন্দর এক বুঝা পড়া। সে কারণে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নিয়ে বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন এই জাতিসংঘের দূতকে। তাকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার আরো এক সমীকরন কাজ করছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কিংবা ২০১৯ সালেও সকল দলের অংশ গ্রহণে তারানকোর ফর্মুলায় নির্বাচন করলে আজকের অর্থমন্ত্রী বয়সের কারণে নিজেই আর নির্বাচন করবেননা। সিলেটের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে দরকার বোস্টনের এই অধ্যাপকের মতো বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির একনিষ্ট সমর্থক ও মুজিব পরিবারের ঘনিষ্ট সহযোগীকে।সেই দ্বিতীয় হিসেবকে মাথায় রেখেই শেখ হাসিনা জাতি সংঘের এই দূতের তৃতীয়বারের মতো মেয়াদ না বাড়িয়ে দেশে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন।
তৃতীয় যে হিসেব শেখ হাসিনার মধ্যে কাজ করছে, তা হলো, অর্থমন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনা চান, আজকের অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে শেখ হাসিনার একান্ত ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা, অর্থমন্ত্রীর মতো মুজিব পরিবারের বিশ্বস্থ এমন এক অর্থনীতিবিদ- প্রয়োজনের সময় যাকে সহজেই এই মন্ত্রণালয়েও আজকের অর্থমন্ত্রীর বয়সের ভারে রিটায়ারের মুহুর্তে রিপ্লেস করা যায় সমান দক্ষতা ও এফিশিয়েন্টের সাথে, যাতে শেখ হাসিনার জন্যে কোন মাথা ব্যাথার কারণ না হয়- সেই হিসেব থেকেও তিনি আজকের জাতি সংঘের দ্যূতকে দেশে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।বোস্টনের এই অধ্যাপক বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময়েই দেশে প্রথম ওয়েজ আর্নার্স স্কিম প্রচলনের প্রস্তাব উত্থাপক- যা বঙ্গবন্ধুর কাছে এতো পছন্দ হয়েছিলো- এক আদেশেই তিনি কার্যকর করেছিলেন।
শেখ হাসিনা চাচ্ছিলেন জাতি সংঘের অর্জন আর বিশ্ব দরবারে বিএনপি জামায়াত জোটের নেতিবাচক প্রচারের বিপরীতে এবারের অর্জনকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির নতুন চাল খেলবেন।মন্ত্রী সভায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনবেন। ডঃ মোমেনকে দেশে ফিরিয়ে এনে আস্তে ধীরে পরিকল্পনা মোতাবেক মন্ত্রণালয় ঢেলে সাজাবেন।
কিন্তু একে একে বিদেশী নাগরিক হত্যাকান্ড, এমপিদের দৌরাত্য সব হিসেবের খাতায় এলোমেলো হয়ে যায়। সেজন্যে হয়তো তিনি মন্ত্রী সভায় বেশী পরিবর্তন না এনে এই মুহুর্তে শুধু বিদেশ মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এনে কাজ শুরু করতে চান।
এদিকে সিলেটে আব্দুজ জহুরের মৃত্যুতে প্রশাসকের পদও শূন্য। এক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজের অধিকারি আওয়ামীলীগ নেতা আ ন ম শফিকুল হক গুডবুকে থাকলেও সিলেটের আগামীদিনের উত্তাল রাজনীতির হিসেব নিকেশে কিছুটা পরিবর্তনও হতে পারে। কামরানকে মেয়র পদে চিন্তা থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে প্রশাসকের ভাগ্যও হয়তো ঝুলে যেতে পারে।কামরান মেয়র কিংবা প্রশাসক হলে মেসবাহ উদ্দিন সেক্রেটারি হয়ে যাবেন।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রীর তালিকায় শেখ হাসিনার গুড বুকে অর্থমন্ত্রীর পরিবারে আরো একজনের নাম রয়েছে। এক সময়ের খ্যাতিমান সফল সচিব, বিশ্বস্থতায় মুজিব পরিবারের ঘনিষ্টজন, অর্থনীতিতে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিধারি ডঃ এ কে আব্দুল মুবিন। ডঃ মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলে ডঃ মুবিন হয়তো এ যাত্রায় টেকনোকেট কোটায় মন্ত্রী না হলেও যেকোন সময় অর্থমন্ত্রণালয়ে চলে আসতে পারেন- (মুহিতের রিটায়ারে)।
হিসেব ঐ একই সমীকরণ শেখ হাসিনার পরিবারের ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্থ।সিলেট থেকে শফিক চৌধুরীর ঘনিষ্টজনেরাও মোহসিনের স্থালাভিষিক্ত তাকে করার জন্যে লবিং করছেন ও আশাবাদী তারা। মরহুম মন্ত্রী মোহসিনের এলাকা ভিত্তিক হিসেব শেখ হাসিনার গুড বুকে থাকলে শফিক চৌধুরীর ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলা যায়।তবে তাকে আরেকটু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। যেহেতু সিলেট বিভাগ থেকে বড় বড় মন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন এবং জাতিসংঘের দূত দেশে এসে নতুন তালিকায় যোগ দিবেন।সব হিসেব নিকেশ ভালোভাবেই করেই ঘোষণা আসতে সময় প্রয়োজন হতে পারে।
শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট কয়েকজন অর্থমন্ত্রীর রিটায়ারের পরে আজকের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ডঃ আতিউরের নাম নিলেও শেখ হাসিনা আতিউরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে এখনি আনতে চাচ্ছেননা- সরকারের স্বচ্ছতার স্বার্থেই। সেক্ষেত্রে আতিউর রিটারের সময়ে সরকারের মুখ্য অর্থ উপদেষ্ঠা হয়ে যেতে পারেন। কেননা বর্তমান মুখ্য উপদেশষ্ঠাও অনেক বয়োজ্যেষ্ট এবং খুব শিগ্রই রিটায়ার করতে পারেন। আবার এই মন্ত্রনালয় পাওয়ার জন্যে অনেক জাদরেল অর্থনীতিবিদেরাও লবিষ্ট করে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে ডঃ আবুল বারাকাতও আছেন।
তবে শেখ হাসিনার বিশ্বস্থ সূত্র নিশ্চিত করেছেন, হাসিনা পরিবারের বিশ্বস্থতার মাপকাঠির বাইরে এই মন্ত্রণালয়ে অন্য কেউ আসার সম্ভাবনা একেবারেই কম। সর্বদিক দিয়ে মুহিত পরিবার শেখ হাসিনার কাছে অধিক প্রিয় ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। কেননা, মুহিত যখন পাকিস্তান সরকারে জাদরেল আমলা, তখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ মুজিবের বিশ্বস্থ একজন যোগ্য সেনাপতি হয়ে কাজ করেছেন সফলতার সাথে, স্বাধীনতা উত্তর বহু সরকার এমনকি জিয়া সরকার, সাত্তার সরকার, সর্বশেষ এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হলেও মুজিব পরিবারের প্রতি থেকেছেন অবিচল, সামরিক সরকারের মন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনার হয়ে কাজ করেছেন সফলতার সাথে।
তাছাড়া শেখ হাসিনা ছাড়াও পুরো শেখ পরিবারের সাথে মুহিত পরিবারের রয়েছে আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর নিখাদ আন্তরিকতা, যেখানে নেই কোন স্বার্থ, কূট রাজনৈতিক কৌশল কিংবা অন্য কোন বিভাজন। আছে শুধু আদি ও অকৃত্রিম ভালোবাসা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জীবতাবস্থায় মুহিত পরিবারকে যেভাবে স্নেহ মমতায় আবদ্ধ করেছেন, শেখ হাসিনা পরিবারের সাথে শত প্রতিকূলতা সত্যেও সেই একই মমতা সমানভাবে আজও বিদ্যমান। মুহিত পরিবারের জাতীয় প্রফেসরের সাথে শেখ হাসিনা এক সাথে পড়া লেখাও করেছেন, শেখ হাসিনার ছোট বোন রেহানাও এই পরিবারের একজন কূটনীতিকের সাথে একইসাথে পড়ালেখা করেছেন। আজকের নতুন প্রজন্মের সাথেও এই দুই পরিবারের সমান বুঝাপড়াও সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠিত।