অন্যকিছু ডেস্ক: ব্রোঞ্জ যুগের কোনো এক সময়ের কথা। বৃটেনের বর্তমান ক্যামব্রিজশায়ার এলাকার নদীর পাড়ে ছিল একটি বাড়ি। কাঠের তৈরি এই গোলাকার বাড়ির বাসিন্দাদের জীবন হঠাৎ করেই থমকে যায়। একদিন যখন বাড়ির বাসিন্দারা খেতে বসেছিলেন, তখনই কোনোভাবে আগুন লাগে বাড়িটিতে।
আর আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলে ওঠে বাড়িটি। খাবার শেষ করার আগেই আগুন থেকে বাঁচতে তাদের ছুটে যেতে হয় বাড়ির বাইরে। এই বাড়িতে আর ফিরে আসতে পারেননি তারা। আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে বাড়িটি পড়ে যায় নদীর মধ্যে। এরপর বাড়িটির ওপর জমতে থাকে পলির আস্তরণ। প্রায় তিন হাজার বছর ধরে এমন পলির আস্তরণ জমে জমে বাড়িটিকে ওভাবেই বাঁচিয়ে রাখে নদীর নিচে।
প্
রায় তিন হাজার বছর পর এসে এই বাড়ির সন্ধান পেয়েছেন বৃটেনের প্রত্নতত্ত্ববিদরা। তারাই বাড়িটির ইতিহাস বর্ণনা করেছেন এভাবে। তারা জানিয়েছেন, এই বাড়িতে সন্ধান মিলেছে নানা ধরনের প্রাচীন বস্তুরই। এর মধ্যে কিছু পাত্রে দেখা গেছে খাবার। প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করছেন, বাড়িতে আগুন লাগার পর এই খাবারগুলোর আর খাওয়ার সুযোগ পাননি বাড়ির বাসিন্দারা।
এছাড়া নানা ধরনের অলঙ্কার ও গৃহস্থালী দ্রব্য পাওয়া গিয়েছে এই বাড়িতে। বৃটেনে এখন পর্যন্ত ব্রোঞ্জ যুগের যত বাসস্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভালো অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ক্যামব্রিজ আর্কিওলজিক্যাল ইউনিট এই প্রাচীন বাড়িটির সন্ধান পেয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাস থেকেই ১৪ জনের এই গবেষক দল এই স্থানে গবেষণা করছেন। শুরুতে তারা এখানে কিছু পোড়া কাঠের সন্ধান পান। এই কাঠগুলো বাড়ির ছাদ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা তাদের।
খনন অব্যাহত রাখলে তারা এই বাড়ি থেকে ব্রোঞ্জ যুগে ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদির সন্ধান পেতে থাকেন। প্রাপ্ত বস্তুগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, এখানে একটি আস্ত বাড়িই অবস্থিত ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, খৃষ্টপূর্ব ৮০০ থেকে ১০০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো সময় পর্যন্ত টিকে ছিল বাড়িটি।
এই বাড়ি থেকে উদ্ধার করা নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ২৯টি মাটির তৈরি পাত্র, অলংকার, বর্শা, ছুরি এবং বেশকিছু পোশাক। এসব পোশাকের বুনন, রঙ প্রভৃতি বিশ্লেষণ করে ওই সময়ের মানুষের ব্যবহৃত পোশাক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। আবার এই বাড়িতে খুঁজে পাওয়া মাটির পাত্রগুলোতে অবশিষ্ট খাবারেরও সন্ধান মিলেছে। ফলে ওই সময়ের মানুষদের খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে এসব পাত্র থেকেই।
এই বাড়ির চত্বরে সন্ধান পাওয়া গেছে ভেড়া, শূকরসহ বেশকিছু গবাদি পশুর হাড়ের। আরও ছিল নয়টি লম্বা নৌকা। এসব উপাদান নৌপথ ছাড়াও শুকনো ভূমি ব্যবহারের সক্ষমতার প্রমাণ দেয় বলে মন্তব্য গবেষকদের। এখান থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন নিদর্শনের মধ্যে পুঁতির দেখা মিলেছে মধ্য ইউরোপে, মাটির পাত্র উত্তর ফ্রান্সে এবং ধাতব বস্তু স্পেনের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে। ফলে এই অধিবাসীরা ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না বলেও ধারণা গবেষকদের।
গবেষক দল বলছে, আরও তিন মাস খনন করে উদ্ধার করা নিদর্শন সকলের সামনে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বৃটেনে সন্ধান পাওয়া এই স্থানটি ব্রোঞ্জ যুগকে বুঝতে আরও বেশি সহায়তা করবে বলেই মনে করছেন তারা। আর এই স্থানকে তারা অভিহিত করছেন বৃটেনের পম্পেই নামে।