বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৫৩

সরিয়ে দেয়া হলো চেয়ারম্যানকে: উদ্বেগ বাড়ছে শাহজালাল বিমানবন্দরে

সরিয়ে দেয়া হলো চেয়ারম্যানকে: উদ্বেগ বাড়ছে শাহজালাল বিমানবন্দরে

নিউজ ডেস্ক: কার্গো পরিবহনে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার পর উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। পশ্চিমা দুনিয়ার ৬০ দেশের প্রতিনিধিত্বকারী বৃটেনের পর এবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা নির্দিষ্ট করে কোনো ডেডলাইন না নিলেও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি চেয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে পরিস্থিতির উত্তরণ চেয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ। শীর্ষস্থানীয় ওই ব্যবসায়ী সংগঠনের বিবৃতিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আশু ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গতকাল দুপুরের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ পক্ষে বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং যুক্তরাজ্যের পক্ষে দেশটির ঢাকাস্থ হাইকমিশনার এলিসন ব্লেক নেতৃত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়, সিভিল এভিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৃটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে তার মিশনের অন্য কর্মকর্তারাও ছিলেন। বৈঠক শেষে বৃটেনের কোনো প্রতিনিধি কথা বলেননি। অবশ্য বিমানমন্ত্রী সরকারের কার্যক্রমের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন। কার্গো পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নতুন করে বৃটেন বা অন্য কেউ যাতে আর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পথে না যেতে পারে সে জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

এদিকে গতকাল বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের বেঁধে দেয়া ৩১শে মার্চের মধ্যে হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে গৃহীত কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে বিমানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ পদস্থ কর্মকর্তাদেরও ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

ওদিকে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও সরজমিন পর্যবেক্ষণে বৃটেনের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় রয়েছে। তারা বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। গতকাল দলটির প্রতিনিধিরা বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছে। আগামী সপ্তাহে একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল ঢাকা আসছে। ২২-২৩শে মার্চ সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করা দলটি বাংলাদেশে অবস্থান করবে। পরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করা আরেকটি দল আসবে। অন্য ইস্যুর সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বাংলাদেশকে কিভাবে সহায়তা করা যায় সেটি মূল্যায়ন করবেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাওয়া হয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশিদের উদ্বেগ এবং কার্গো পরিবহনে বৃটেনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, এটি কেবল একটি বা দুটি দেশের বিষয় নয়। কার্গো নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন জড়িয়ে গেছে। তার মতে বিদেশিরা যদি বাংলাদেশের বিমানবন্দরকে নিরাপদই মনে না করে তা হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক সব কিছুই বিপদের মুখে পড়বে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আরও পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয়ার তাগিদ দেন ওই কূটনীতিক।

উৎকণ্ঠায় ডিসিসিআই: কার্গো পরিবহনে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা তুলতে সরকারকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। গতকাল এক বিবৃতিতে ব্যবসায়ী সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম রেজাউল কবির বলেন, এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আশু ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গত ৮ই মার্চ যুক্তরাজ্য সরকার নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ঢাকা থেকে যুক্তরাজ্যগামী কার্গো বিমানের সরাসরি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কথা জানায়।

এতে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে এর আগে গত ১০ই মার্চ বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় খাত পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানে প্রয়োজনে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ গ্রহণের দাবি জানান। ব্যয় সাশ্রয়ী বলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক মূলত সমুদ্রপথেই রপ্তানি হয়। তবে কখনও জাহাজে পণ্য পাঠানো সম্ভব না হলে কিংবা দেরি এড়াতে বিমানে পাঠানো হয়।

ওই নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন যুক্তরাজ্যে পণ্য পাঠাতে হলে সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড কিংবা দুবাই হয়ে পাঠাতে হবে, যাতে খরচও বাড়বে, সময়ও বেশি লাগবে। ডিসিসিআই সেক্রেটারি জেনারেল রেজাউল বলেন, সঙ্গত কারণে আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের তৃতীয় বৃহত্তম ক্রেতা দেশ যুক্তরাজ্য। তাই তাদের এই ঘোষণা আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

ওই নিষেধাজ্ঞার কারণ সম্পর্কে যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সমপ্রতি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিতের প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় সেখানে পূরণ করা হয়নি। সাময়িক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ঢাকা থেকে যুক্তরাজ্যে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট ঢুকতে দেয়া হবে না। একই কারণ দেখিয়ে এর আগে গত ১৯শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের কার্গো বিমানের ফ্লাইট নিষিদ্ধ করে অস্ট্রেলিয়া।

বিবৃতিতে এ প্রসঙ্গ তুলে ডিসিসিআই সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে ৩ হাজার ২০৫ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ; আমদানি করেছে ৩৩০ দশমিক৭২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। বৃটিশ দলের বিমানবন্দর পরিদর্শন: এদিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যুক্তরাজ্যের ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল বিমানবন্দর পরিদর্শন করে। সরকারি একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করে।

সূত্রগুলো জানায়, গত ৩ দিন ধরে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে রয়েছে। তারা বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি কার্গো নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ওই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গতকাল তারা বিমানবন্দর পরিদর্শনে যান।

বৃটিশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধিদের বৈঠক: বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীতকরণ এবং ঢাকা থেকে সরাসরি যুক্তরাজ্যে কার্গো ফ্লাইটের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার এলিসন ব্লেকের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শেষে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

সেখানে বলা হয়, বৈঠকে বিমান মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহম্মেদ সিদ্দিকী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরী, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম সানাউল হক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান, মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল হাসনাত জিয়াউল হক ও মন্ত্রীর একান্ত সচিব এটিএম নাসির মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

সভায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন ও কার্গো কমপ্লেক্সকে ঢেলে সাজাতে বৃটিশ প্রতিনিধি দল শর্টটার্ম, মিডটার্ম ও লংটার্ম সংবলিত একটি পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। এক প্রস্তাবনার আলোকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এই কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ২০শে মার্চ এ কমিটির সঙ্গে একটি রিভিউ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

বেবিচকে নতুন চেয়ারম্যান: এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গনি চৌধুরী। গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম সানাউল হককে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গণি চৌধুরীকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের জন্য বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হলো।

ওদিকে একই প্রজ্ঞাপনে এয়ার ভাইস মার্শাল এম সানাউল হককে বেবিচক চেয়ারম্যান থেকে প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের জন্য তার চাকরি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে প্রত্যর্পণ করা হলো।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2025