শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: আশুগঞ্জ বন্দরে ভারত থেকে আসা পণ্য খালাস করার পর বাসযোগে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আগরতলায় যাবে। এরইমধ্যে দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ নৌ ট্রানজিট বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হচ্ছে।
নৌ প্রটোকল চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে এটি হবে নিয়মিত ট্রানজিট। কলকাতা থেকে রওনা হয়ে এক হাজার টন ইস্পাতের পাত বা স্টিল শিট বোঝাই জাহাজ এমভি নিউটেক-৬ ইতিমধ্যে আশুগঞ্জ নৌবন্দরে ভিড়েছে। আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এ ট্রানজিটের উদ্বোধন করা হবে। জাহাজটি থেকে পণ্য খালাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হবে নৌ ট্রানজিটের।
ভারত যদি ট্রানজিট না নিয়ে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি (পশ্চিমবঙ্গ), শিলং (মেঘালয়) হয়ে সড়কপথে আগরতলায় পণ্য নেয়; তবে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটারের মতো পথ পাড়ি দিতে হতো। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট নেওয়ায় দূরত্ব দাঁড়ায় ৫০০ কিলোমিটারের মতো। ফলে টনপ্রতি ১৯২ টাকা মাশুল ফি দেওয়ার পরেও ভারত কম খরচে এখন থেকে পণ্য পাঠাতে পারবে।
পণ্যের শুল্ক, সড়ক ও বন্দর ব্যবহারের জন্য তিনটি পর্যায়ে ফি বা মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন পণ্যের জন্য শুল্ক ফি ধরা হয়েছে ১৩০ টাকা, রোড চার্জ প্রতি কিলোমিটারে ৫২ টাকা ২২ পয়সা, বন্দর ব্যবহারের জন্য ১০ টাকা পাবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ১৯২ টাকা দিয়ে ভারতের এক মেট্রিক টন পণ্য বাংলাদেশ দিয়ে আবার ভারতে যাবে।
তবে ভারত, নেপাল ও ভুটানকে সড়ক, রেল ও নৌপথে ট্রানজিট দিতে ২০১১ সালে ট্যারিফ কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কোর কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সুপারিশ ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৫৮ টাকা মাশুল নেওয়া। কিন্তু এখন নেওয়া হচ্ছে সুপারিশের পাঁচ ভাগের একভাগেরও কম।
নৌ মন্ত্রণালয় সূত্র জানান, এর আগেও দু-একটি ক্ষেত্রে নৌ ট্রানজিট দেওয়া হয়েছিল ভারতকে। তবে সেটা ছিল অনানুষ্ঠানিক। আনুষ্ঠানিকভাবে এবারই প্রথম মাশুলের বিনিময়ে ভারতের পণ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশের নৌ সীমানায় প্রবেশ করছে। ভারতের সাতটি বন্দর থেকে পণ্য আসবে বাংলাদেশের আশুগঞ্জ বন্দরে। বাংলাদেশ থেকে সড়ক পথে পণ্য ভারতে যাবে। যেহেতু ভারত একটি বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পণ্য পাঠাবে, তাই ভারতই ঠিক করবে কোন পণ্য ট্রানজিট হবে। তবে নিষিদ্ধ কোনো জিনিস পরিবহন করবে না তারা। সেটা নিশ্চিত করা হবে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রানজিটকে কেন্দ্র করে আশুগঞ্জ নৌবন্দরে তেমন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। একটি ভাঙাচোরা পাকা ঘাট আছে। এমনকি পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য নেই কোনো ক্রেন; মাথায় করেই পণ্য ট্রাকে তোলা হয়। ঘাট এলাকায় একটি ছোট গুদাম ও দুটি কামরা থাকলেও সেখানে কেউ অফিস করেন না। ঘাট থেকে মূল সড়কে যাওয়ার জন্য আধা কিলোমিটার সংযোগ সড়কটি ভাঙাচোরা ও সরু; কোথাও কোথাও কাদা আর জলাবদ্ধতা। গতকাল বুধবার ঘটনাস্থলে গিয়ে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
১৯৭২ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে ট্রানজিটের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এরপর ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ট্রানজিটের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। তবে ফি নির্ধারণ, অবকাঠামো দুর্বলতাসহ নানা সমালোচনার কারণে ট্রানজিট নিয়ে কেউ আর এগোয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌ প্রটোকল চুক্তিতে বন্দর ব্যবহারের বিধান না থাকায় ভারতকে এতদিন তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এলে এই চুক্তি সংশোধন করে বাংলাদেশ। এরপর গত বছর দিল্লিতে মাশুল নির্ধারণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। মূলত এরপর থেকেই ট্রানজিটের বিষয়ে ভারত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে বেশি।
সর্বশেষ দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে ট্রানজিটের রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারতের চেন্নাই, কৃষ্ণপত্তম, বিশাখাপত্তম, কাশিনাদা, প্যারা দ্বীপ, হলদিয়া ও কলকাতা নৌবন্দর থেকে পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়বে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মংলা, খুলনা, পায়রা, নারায়ণগঞ্জ, পানগাঁও ও আশুগঞ্জ বন্দরে। বন্দর থেকে পণ্য খালাস হলে বাংলাদেশি ট্রাক সেই পণ্য নিয়ে যাবে ভারতে।