শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজেদেরকে ভালভাবেই জানান দিচ্ছে এফবিআই। নির্বাচন যখন একেবারে দোরগোড়ায় তখন তারা ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের বেশ কিছু নতুন ইমেইল পাওয়া ও সে সম্পর্কে অনুসন্ধানের ঘোষণা দিয়েছে। এ নিয়ে ডেমোক্রেটরা ক্ষুব্ধ। তাদের দ্বিমুখী অবস্থানের সমালোচনা করেছে ডেমোক্রেটরা।
তীব্
র প্রতিবাদ জানালেও এফবিআই চুপসে যায় নি। উল্টো মঙ্গলবার অপ্রত্যাশিত, অকস্মাৎ আর এক কান্ড ঘটিয়ে বসেছে। হিলারি ক্লিনটনের স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের অনুসন্ধানের ১২৯ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট প্রকাশ করে দিয়েছে মঙ্গলবার।
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কিভাবে পলাতক মার্ক রিচ’কে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন তার অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব ফাইল। এর মধ্য দিয়ে এ নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে যেন এফবিআই’ই বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে হিলারির।
কারণ, নির্বাচনের আর পুরো এক সপ্তাহও সময় বাকি নেই। এ সময়ে কেন এসব ফাইল প্রকাশ! এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তো অবশ্যই একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এত বছরেও বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ওই ফাইল প্রকাশ হলো না, এখন কেন নির্বাচনের একেবারের শেষ মুহূর্তে এগুলো সামনে আনা হচ্ছেÑ তা নিয়ে প্রশ্ন সচেতন মহলের মধ্যে। এফবিআইকান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী পরিবেশ পাল্টে যেতে শুরু করেছে। হিলারির ইমেইলে কি আছে সে সম্পর্কে বিশ্ববাসী এখনও অন্ধাকারে। বিষয়টি পরিষ্কার না হলেও মার্কিন ভোটাররা সন্দিহান হয়ে পড়েছেন।
ফলে জনমত জরিপে হিলারির সমর্থন কমতে শুরু করেছে। অনেক জরিপে তিনি এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান খুব অল্প। তবে এবিসির এক জরিপে হিলারিকে টপকে গেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তাকে সমর্থন করেছেন শতকরা ৪৬ ভাগ ভোটার। হিলারিকে সমর্থন করেছেন শতকরা ৪৫ ভাগ।
অর্থাৎ শতকরা এক ভাগ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন ট্রাম্প। এ অবস্থায় ভোটের লড়াইয়ে সুইং স্টেট ফ্লোরিডা, পেনসিলভ্যানিয়া ও উইসকনসিন চষে বেড়াচ্ছেন দু’প্রার্থী। ইমেইল ইস্যুতে গত প্রায় এক সপ্তাহ হিলারি ক্লিনটন ও তার প্রচারণা শিবির এফবিআই ও এর প্রধান জেমস কমির সমালোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার হিলারি তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণিত করেছেন। তিনি তাকে নারী ইস্যুতে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্প নারীদের যেভাবে দেখেন তার সমালোচনা করেন। হিলারি বলেন, নারীদের অপমাননা, অসম্মানিত করা, হয়রানি করার, নির্যাতিত করার ৩০ বছরের ইতিহাস আছে ট্রাম্পের।
অন্যদিকে হিলারিকে দুর্নীতিবাজ বলে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার দু’প্রার্থী একে অন্যকে এভাবেই আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্প এ সময় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবাকে চিরদিনের জন্য ধ্বংস করে দেবেন হিলারি। তিনি এসময় আগাম ভোটদাতাদের প্রতি তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের আহ্বান জানান। হিলারিকে যারা ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদের মত পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ওদিকে হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনমত জরিপে সামনে এগিয়ে আসছেন ট্রাম্প।
এ কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরণের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। এর ফলে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইয়েন ও ইউরোর বিপরীতে ডলারের দাম সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। জাপানের রাজধানী টোকিওতে বারক্লেতে জাপান এফএক্স প্রধান স্ট্রাটেজিস্ট শিন কাদোতা বলেছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হিলারি এখনও এগিয়ে থাকলেও যদি নতুন কোনো জরিপে দেখা যায় তাকে ধরে ফেলেছেন ট্রাম্প তাহলে ডলারের দাম আরও পড়ে যেতে পারে। ওদিকে একই সময়ে চার সপ্তাহের মধ্যে স্বর্ণের দাম বেড়েছে বেশি।
উল্লেখ্য, এরই মধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমস খবর প্রকাশ করেছে যে, ১৯৯০ এর দশকে ব্যবসায় লোকসান দেখিয়ে প্রায় ১০০ কোটি ডলার আয়কর ফাঁকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এ ইস্যুতে আছেই। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রীতি ভঙ্গ করে তিনি এবার আয়কর রিটার্ন প্রকাশ করেন নি। এসব নিয়ে সমালোচনা বিস্তর।
এ ইস্যুতে তার কোনো অজুহাত আমলে নেয়া উচিত নয় বলে ফ্লোরিডায় এক নির্বাচনী সমাবেশে মন্তব্য করেছেন হিলারি। ওদিকে অনলাইন সিএনএন লিখেছে, অপ্রত্যাশিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের কেন্দ্রে চলে এসেছে এফবিআই। এ নিয়ে চারদিকে হতাশা, সন্দেহ তীব্র হচ্ছে। ডেমোক্রেটরা গত প্রায় ৫ দিন ধরে এফবিআইয়ের কর্মকান্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
এতে জড়িয়ে পড়ছেন কিছু রিপাবলিকানও। অভিযোগ করা হচ্ছে হিলারি ও ট্রাম্পের মধ্যে লড়াইয়ে অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করছে এফবিআই। এটা এখন নিশ্চিত যে, এক সময়ের নিবন্ধিত রিপাবলিকান এফবিআই প্রধান জেমস কমি। তিনি রিপাবলিকান দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এর আগে মনোনয়ন পাওয়া জন ম্যাককেইন ও মিট রমনির জন্য কাজ করেছিলেন।
এবার প্রচারণার বাকিটা সময় তিনি স্পটলাইটে থাকবেন। নিউ ইয়র্কের ডেমোক্রেট দলের কংগ্রেসম্যান হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, এ আরেকটি অন্যরকম ব্যাপার। এখন আমরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত সময়ে রয়েছি। তিনি সিএনএনের উলফ ব্লিটজারের ‘দ্য সিচুয়েশন রুম’ অনুষ্ঠানে বলেন, এফবিআইয়ের কারণে এখন আমরা ইমেইল নিয়ে কথা বলছি। এর কোনো মানে হয় না। এফবিআই ও এর পরিচালকের কাছে মার্কিন জনগণ ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করে।
তবে মার্ক রিচ ঘটনায় বিল ক্লিনটনের ফাইল প্রকাশ করার পিছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য নেই বলে জানিয়েছে এফবিআই। তারা বলেছে, তথ্য পাওয়ার অধিকার সংক্রান্ত আইনের অধীনে এসব প্রকাশ করেছে তারা। এফবিআই থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে।
তাতে বলা হয়েছে, এসব ডকুমেন্ট প্রকাশ করে দেয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল এবং তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশের তালিকায় এসে পড়ে। এফবিআইয়ের পাবলিক রিডিং রুমে এগুলো দেয়া হয় আইন অনুযায়ী। অন্যদিকে হাউজ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্রেট ইলিয়ট ইঙ্গেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, এটা এখন বন্ধ হওয়া উচিত।
এফবিআই প্রধান জেমস কমির উচিত স্বচ্ছতা প্রদর্শন করা। কিন্তু এখন জনতার দৃষ্টিতে তা হারিয়ে গেছে। আমেরিকার মানুষ জানতে চায় কেন তিনি রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়টি গোপন রেখেছেন। উল্টো কেন তিনি এসব ইমেইল প্রকাশ করছেন। এই অবস্থা তারই পরিষ্কার করা উচিত।
রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সমএর্কর যে কথা বলা হচ্ছে সে সম্পর্কে অনেক অনুসন্ধান করেছে এফবিআই। এতে ক্রিমিনাল কর্মকান্ডের কোনো প্রমাণ মেলে নি। তবে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মাইকেল মোরেল এফবিআই প্রধান জেমস কমির তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তিনি ডেভিড এক্সেলরডকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, আমি মনে করি জেমস কমি তার প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সাবেক এটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে জেমস কমির প্রসঙ্গে লিখেছেন। বলেছেন, মানুষ ভুল করছে। আমি মনে করি জেমস কমি এখানে ভয়াবহ সব ভুল করছেন।