আর্ন্তজাতিক নিউজ ডেস্ক: মিডিয়ার রিপোর্ট বলছে অপারেশনের পর উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম নেতা কিম জং-উনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে নিরপেক্ষ কোনো মাধ্যম থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় নি। হতে পারে এ রিপোর্ট ভুল। হতে পারে সঠিক।
তবে অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ইভেন্টে তার অনুপস্থিতি পরিস্থিতি ভালোর দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে না। এ অবস্থায় তার শুভ কামনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যদি তিনি গুরুত্বর অসুস্থই হয়ে থাকেন এবং মারা যান তাহলে পারমাণবিক শক্তিধর আড়াই কোটি মানুষের এই দেশটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। অতি স্পর্শকাতর পারমাণবিক শক্তিধর এ দেশটিকে বিশে^র অনেক পরাশক্তিই সমীহ করে চলে।
সে ক্ষেত্রে পুরো বিশ্বকে বগলদাবা করে রাখার মতো আর কে আছেন! এখানে উল্লেখ্য, গত সাতটি দশক বা ৭০ বছর উত্তর কোরিয়া শাসন করছে একই পরিবার। ফলে যদি কিম জং-উন মারা যান, তাহলে এই পরিবার থেকেই কেউ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন। কে হতে পারেন তিনি?
দক্ষিণ কোরিয়ার সেজং ইন্সটিটিউটের বিশ্লেষক চেওং সেওং-চ্যাং বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, এক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতায় আসার শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কিমং জং উনের বোন কিম ইয়ো জং-এর। আসলে যখন প্রকৃত সত্য গোপন রাখা হয়, বাইরের দুনিয়ার কাউকে জানতে দেয়া হয় না, তখন নানা রকম জল্পনা-কল্পনা ডালপালা বিস্তার করে। কিন্তু নির্ভর করা যায় এমন সব ওয়েবসাইটে যেসব রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে বা হচ্ছে তাতে আশঙ্কার মাত্রাটা বাড়িয়েই দেয়।
এ সপ্তাহের শুরুতে সিউলভিত্তিক ওয়েবসাইট ডেইলি এনকে খবর প্রকাশ করে যে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের হার্টে অপারেশন করানো হয়েছে। এরপর তিনি রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের বাইরে একটি ভিলায় অবস্থান করছেন। এর পর সিএনএন যুক্তরাষ্ট্রের অজ্ঞাত এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্ট করে যে, উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম নেতার অবস্থা মারাত্মক।
এক্ষেত্রে ইংরেজিতে দুটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তা হলো তিনি ‘গ্রেভ ডেঞ্জার’ অবস্থায় রয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তদন্তের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। আশঙ্কার মাত্রাটা আরো বেড়ে গেছে গত ১৫ই এপ্রিলের পরে। এদিনটি উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও কিম জং উনের গ্রান্ডফাদার কিম ইল সাংয়ের জন্মদিন।
এই জন্মদিনের অনুষ্ঠান সেখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। সেখানে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান নেতার উপস্থিতি যেন বাধ্যতামুলক। কিন্তু এবার সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন না কিম জং উন। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন- এসব বিষয় এড়িয়ে যায় রাষ্ট্রীয় মিডিয়া। তিনি উপস্থিত না থাকলেও সব জায়গা তার পোস্টার লাগিয়ে দেয়া হয়। বিষয়টি অস্বাভাবিক।
কিম জং উনের যে হার্টের অপারেশন হয়েছে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি দক্ষিণ কোরিয়া। আর চীনতো পুরো এমন কথা প্রত্যাখ্যানই করেছে। তবে কিম জং উনের অপারেশনের খবর শুনে গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে ‘গুড লাক’ জানিয়েছেন। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউজে প্রেস ব্রিফিংয়ে কিম জং উনের স্বাস্থ্যের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেন, এসব রিপোর্ট আমরা পাচ্ছি। তবে এখনও এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানি না। তার সঙ্গে আমার খুব ভাল সম্পর্ক। ফলে বিশে^র এক নম্বর শক্তিধর ব্যক্তি যখন এ কথা বলেন, তখন নিশ্চিত করে কেউই আসলে বলতে পারছেন না কিম জং উনের অবস্থা আসলে কি! তাছাড়া মিডিয়ায় এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও উত্তর কোরিয়া থেকে এ বিষয়ে কোনো বিবৃতিও দেয়া হচ্ছে না, কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখানো হচ্ছে না।
এ অবস্থায় যদি কিম জং উনের অবস্থার অবনতি ঘটে, যদি তিনি মারা যান, তাহলে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় তার বোনের সম্ভাবনার বিষয়ে জোর দিয়েছেন বিশ্লেষক চেওং সেওং-চ্যাং। তিনি বলেন, তার মধ্যে রয়েছে ‘রয়েল ব্লাড’। আর উত্তর কোরিয়া বংশানুক্রমিক রাজনীতির। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন যখন উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেন, তখন তার পাশে ছিলেন তার বোন কিম ইয়ো জং।
ফলে অনেক পর্যবেক্ষক তখন থেকেই তাকে উত্তর কোরিয়ায় তার ভাইয়ের পরে দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। তবে অন্যরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, উত্তর কোরিয়ার শাসন ক্ষমতায় বাধা রয়েছে কিম ইয়ো জংয়ের জন্য। ২০১৭ সালে ব্লুমবার্গ একটি রিপোর্টে বলেছিল, উত্তর কোরিয়ার রাজনীতি হলো পুরুষের আধিপত্যমুলক, পক্ষপাতী নেতৃত্বের। ফলে একজন যোগ্য উত্তরসুরি হিসেবে ওই রিপোর্টে কিম ইয়ো জংকে দূরে সরিয়ে রাখে ওই রিপোর্ট।
বাকি থাকেন কিম জং উনের বড় ও সৎভাই কিম জং নাম। তিনি বসবাস করছিলেন ম্যাকাউয়ে। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে বায়ু গ্যাস প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা হয় ২০১৭ সালেই। তাকে টার্গেটে রাখা হয়েছিল বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তিনি তার ছোটভাই কিম জং উনের কাছে নিজের প্রাণভিক্ষা চেয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন।
এর বাইরে কিম জং উনের আরেকজন ভাই আছেন। তিনি তার চেয়ে বড়। তার নাম কিম জং চোল। ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, রাজনীতিতে বা সরকারি দায়িত্বে তার কোন আগ্রহ নেই। তার প্রয়াত পিতা কিম জং ইল তাকে ক্ষমতায় খুব লাজুক বলে অভিহিত করেছিলেন।
তিনি একজন মেধাবী গিটার বাদক। পাঁচ বছর আগে তিনি এরিক ক্লাপটন কনসার্টে পারফরম করেছিলেন। ফলে খুব কম সংখ্যক মানুষই বিশ্বাস করেন যে, তিনি নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন। তবে এটা সত্য তার মধ্যে রাজপরিবারের রক্ত রয়েছে এবং তিনি একজন পুরুষ। ফলে তার মধ্যেও নেতৃত্ব জেগে উঠতে পারে।
এসব সম্ভাবনার বাইরে কিম জং উনের আছে কয়েকটি সন্তান। তবে তাদের কারো বয়স সরকারি দায়িত্ব নেয়ার মতো নয়। এরও বাইরে তার আছেন ৬৫ বছর বয়সী একজন আঙ্কেল। তার নাম কিম পিয়ং ইল। কয়েক দশক ইউরোপে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন শেষে গত নভেম্বরে দেশে ফিরেছেন তিনি।
কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে ছিলেন অনেক সময়। কিম জং উনের আরেক আঙ্কেল জাং সোং থায়েক। তিনি এক সময় উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। কিম জং উন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার মাত্র দু’বছর পরেই তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
তাহলে কি ঘনিষ্ঠ পরিবারের বাইরে কেউ আছেন ক্ষমতা নেয়ার মতো? এমন একজন হলেন চোই রিওং হাই। তিনি গত বছর সুপ্রিম পিপলস এসেম্বলির প্রেসিডিয়ামের প্রেসিডেন্ট হন। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের একজন করে তোলেন। তিনি ক্ষমতাসীন পরিবারকে কয়েক দশক ধরে সেবা দিয়ে আসছেন। তবে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে রক্তের সম্পর্ক সেটা নেই কিম জং উনের।
তাহলে কি ঘটবে? এরপর রাজপরিবার ও পরিবারের প্রতি আনুগত্যশীল সিনিয়র ব্যক্তিদের নিয়ে কি একটি সমন্বিত নেতৃত্ব গড়ে উঠবে! যদি তাই হয়, তাহলে সেই নেতৃত্বে কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং হয়ে উঠতে পারেন বড় একটি শক্তি, যদিও তিনি নারী। এক্ষেত্রে চোই রিওং হাই ও অন্যরা হবেন নেতৃত্বের ওপরের আবরণ।
আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করেন, কিম জং উন মারা গেলে উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে ওই অঞ্চলের জন্য এটা হতে পারে বিপজ্জনক। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রগুলো পড়ে যেতে পারে ভুল হাতে। আর এর ফলে যেটা ঘটতে পারে তাহলো দলে দলে ¯্রােতের মতো শরণার্থীর ঢল নামতে পারে চীনের দিকে।
তবে একথা আবারো স্মরণ করিয়ে দেয়া ভালো যে, এসবই নির্ভর করছে কিম জং উনের শারীরিক সুস্থতার ওপর। তিনি এখনও যুবক। চমৎকারভাবে দেশের ক্ষমতাকে নিজের হাতে ধরে রেখেছেন। যদি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে তিনি ফিরে আসেন তাহলে আগামী ২০১৭ সাল নাগাদ তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। এ সময়ে পশ্চিমে হয়তো অনেক নেতা আসবেন, যাবেন।
– অনলাইন কোয়ার্টজ এবং সিএনবিসি অবলম্বনে