শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা: বকেয়া পাওনা পরিশোধ নিয়ে বৃটেনের বেশ কয়েকটি ব্রান্ডের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তাতকারকদের। তাদের দাবি তারা এসব ব্রান্ডের কাছে বহু মিলিয়ন ডলার পাওনা। অর্ডার বাতিল বা পাওনা পরিশোধ না করায় এসব ব্রান্ডের বিরুদ্ধে এমবারগো বা নিষেধাজ্ঞা দেয়ার হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকরা।
তাদের দাবি, এসব ব্রান্ড করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আগে যেসব অর্ডার দিয়েছিল, তার জন্য তাদের কাছে বহু মিলিয়ন ডলার পাওনা আছে। এ জন্য বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) বৃহস্পতিবার একটি চিঠি পাঠিয়েছে ফিলিপ ডে’র কাছে।
ফিলিপ ডে হলেন এডনবার্গ উলেন মিল (ইডব্লিউএম) গ্রুপের বিলিয়নিয়ার মালিক। পিককস জায়েগার, বোনমার্চে, অস্ট্রিন রিড ও বৃটিশ আরো বহু ব্রান্ডের মালিক এই গ্রুপটি। ওই চিঠিতে ফিলিড ডের কাছে দাবি করা হয়েছে, সরবরাহকারীদের সব পাওনা মিটিয়ে দিতে অথবা ২৯ শে মে শুক্রবারের মধ্যে সমঝোতায় আসতে।
স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত বিজিএমইএর সাম্প্রতিক এক ডাটা অনুযায়ী, বাংলাদেশী কারখানাগুলোর কাছে ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ ডলার দেনা আছে ইডব্লিউএম। এই অর্থ পরিশোধ করা না হলে বাংলাদেশ থেকে ভবিষ্যতে পোশাকের অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে বা তাদেরকে ব্লক করে দেয়া হবে।
বিজিএমইএর ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের নজরে এসেছে যে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকে বকেয়া পরিশোধ না করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বায়ার। এ ছাড়া তারা অযৌক্তিক ডিসকাউন্ট দাবি করছে, যদিও এসব অর্ডার ছিল কোভিড-১৯ সংক্রমণের আগে এবং এর উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। তাদের এসব দাবি আমাদের সদস্যদের মেনে নেয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তাদের এ দাবি স্থানীয় আইনের লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য নয়।
ফিলিপ ডে নিজে লো প্রোফাইল রক্ষা করে চলেন। তবে তার কোম্পানি বিশাল। তাতে কাজ করেন ২৫ হাজার কর্মী। আছে ১৩ শতাধিক স্টোর। করোনা মহামারি শুরুর আগে তাদের আর্থিক অবস্থা ছিল ভাল। তাদের হাতে ছিল উল্লেখযোগ্য ক্যাশ অর্থ।
বাংলাদেশের ওই চিঠির জবাব শনিবার দিয়েছে ইডব্লিউএম গ্রুপ। এতে ওই চিঠির আহ্বানকে অফলপ্রসূ ও অসহযোগিতামুলক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাশাপাশি সব সরবরাহকারীর সঙ্গে হাতে হাত রেখে সমাধান বের করার জন্য কাজ করার কথা বলেছে তারা। কিন্তু কোম্পানির এই বিবৃতিতে আপত্তি আছে বাংলাদেশের কারখানা মালিক ও শ্রম অধিকারকর্মীদের।
এই ঘটনা পোশাক শিল্পে উত্তেজনাকে বৃদ্ধিই করছে, যে শিল্পের বিক্রি মার্চ ও এপ্রিলে রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। এই লড়াইয়ের মূল প্রশ্ন হলো, কে এই শিল্পের আর্থিক ক্ষতির দায় বহন করবে: খুচরা ক্রেতারা? যারা ডিজাইন করে এবং পোশাক মার্কেটে দেয়, লাভ তোলে। নাকি কারখানা? যারা সম্মিলিতভাবে এসব পোশাক তৈরি করে। গত মার্চ থেকে রিটেইলারগুলো সাপ্লাইন চেইন ভেঙ্গে তাদের অর্ডারগুলো বাতিল করতে শুরু করে। তবে নিয়ম অনুযায়ী, কাজ শেষ হওয়া পোশাকের জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু তা না করায় বাংলাদেশি কারখানা মালিকরা বড় ধরণের ঋণের মধ্যে পড়ে যায়।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার পর বেশ কয়েকটি ব্রান্ড তাদের বাকি অর্থ পরিশোধ করেছে। চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে শ্রমিক অধিকার সংগঠন ডব্লিউআরসির নির্বাহী পরিচালক স্কট নোভা বলেন, ব্রান্ডগুলো তাদের সরবরাহকারীদের সঙ্গে যা করছে তার কোনো অর্থ হতে পারে না। এখন অন্য ক্রেতারা একটি বার্তা পাবেন যে, এ ধরণের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা থাকলে তা উৎপাদনকারীদের সঙ্গে স¤পর্ক নষ্টের কারণ হতে পারে।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে ইডব্লিউএম কাজ শেষ হওয়া পণ্যের জন্য ৭০ শতাংশ ছাড় দাবি করে। এর ফলে বাংলাদেশি উৎপাদনকারীরা বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হন। বাংলাদেশি পোশাক শিল্প মালিকদের ইতিমধ্যেই অস্বাভাবিক কম মূল্য অফার করা হয়েছে। এরমধ্যে খবর পাওয়া গেছে, ইডব্লিউএম গ্রুপ নতুন নতুন কারখানার সঙ্গে যোগাযোগ করছে পণ্যের জন্য, যেখানে তারা পূর্বের কারখানাগুলোর ঋণ পরিশোধ করেনি। এ নিয়ে কারখানা মালিকরা নিজেদের মধ্যে ভাইবার গ্রুপে আলোচনাও করেছেন। ডেনিম এক্সপার্টের মালিক মোস্তাফিজ উদ্দিন বলেন, আমার কাছে ওই আলোচনার স্ক্রিনশট এসেছে। তারা অবশ্যই অসৎ কো¤পানি। কেউ তাদের ডাকে সাড়া দেবেন না। বাংলাদেশের আরেক নীটওয়্যার কো¤পানির মালিক বলেন, এখন সময় এসেছে যেসব ক্রেতা অসৎভাবে ব্যবসার চর্চা করছে তাদেরকে না বলার।
পোশাল শিল্পের মালিকরা এখনো বড় বড় ব্রান্ডগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নিজেরাও বেশ বড় ধরণের সফলতা পেয়েছেন। বর্তমানে চলতে থাকা ক্রয়াদেশ বাতিল তাদের এই ধারাকে আরো গতিশীল করবে। বাংলাদেশে বর্তমানে পৃথিবীর সব থেকে বেশি এলইইডি সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে। মহামারির আগে থেকেই এসব কারখানা কমমূল্যে পোশাক রপ্তানির কৌশল থেকে সরে আসার পরিকল্পনা করছিলো। এরকম অনেক কারণই রয়েছে যা থেকে বুঝা যায় সামনের দিনগুলোতে কারখানাগুলোই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকবে। চীনে শ্রমের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ খুব দারুণ বিকল্প হয়ে উঠছে ফ্যাশন ব্রান্ডগুলোর জন্য। এটি সামনে কো¤পানিগুলোকে আপোষে বাধ্য করতে পারে। সামনে থেকে ব্যবসায়িক চুক্তিতে ব্রান্ডগুলোকে আরো কঠিন নিয়মে স্বাক্ষর করতে হবে।