শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা: অবশেষে ৫ দিন বন্ধ থাকার পর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দর দিয়ে শনিবার দুপুর থেকে আবারো পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে।
এদিকে, ভারতের ঘোজাডাঙ্গা বন্দরে আটকে থাকা ২৫৫ ট্রাকের মধ্যে কাগজ পত্র প্রস্তুত রয়েছে এমন ভারতীয় পিয়াজ বাহি মোট ৩২টি ট্রাক আজ ভোমরা বন্দরে প্রবেশ করবে বলে জানিয়েছেন ভোমরা সিএন্ডএফ এজন্ট এ্যাসোসিয়েশনের বন্দর বিষয়ক সম্পাদক আমির হামজা।
ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম জানান, পূর্বের এলসি করা ২৫৫ টি পিয়াজ ভর্তি ট্রাক ভারতের ঘোজাডাঙ্গা বন্দরে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে আজ কাগজ পত্র প্রস্তুত রয়েছে এমন মোট ৩২টি ট্রাক ভোমরা বন্দরে প্রবেশ করবে। প্রতি ট্রাকে ২২ থেকে ২৫ টন পিয়াজ আমদানি হবে বলে জানান এই সিএন্ডএফ নেতা। বাকী গুলো পর্যায়ক্রমে প্রবেশ করবে।
তবে, ভারত সরকার ভোমরা ও হিলিসহ তিনটি বন্দর দিয়ে মোট ২৫ হাজার মেট্রিকটন পিয়াজ বাংলাদেশে রপ্তানীর ঘোষনা দিয়েছেন। সেই হিসেবে ৮ হাজার মেট্রিকটন পিয়াজ ভোমরা বন্দর দিয়ে আসার কথা। এই ঘোষনার পর শনিবার দুপুর ১টা থেকে পিয়াজ আসতে শুরু করে। তবে ৫দিন আটকে থাকার কারনে অনেক পিয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়িরা।
ভোমরা স্থল বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মহসিন হোসেন জানান, আজ দুপুর ১টা থেকে পিয়াজ আসতে শুরু করেছে। কতটা পেঁয়াজ আসবে তা ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলে জানান তিনি।
বস্তুত ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিজিএফটি (ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড) বা বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের ওই বিজ্ঞপ্তিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কম অবাক হয়নি। বিদেশে রফতানি বন্ধ করার আগে ডিজিএফটি তাদের সঙ্গে পরামর্শ দূরে থাক, এমন একটা সিদ্ধান্ত যে নেওয়া হচ্ছে সেটাও সাউথ ব্লককে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) জানায়নি। পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা পর্যন্ত এ কারণে ঘনিষ্ঠ বৃত্তে তার অসন্তোষ গোপন করেননি।
তবে ডিজিএফটি এরপর অনানুষ্ঠানিকভাবে যে ব্যাখ্যা দেয় সেটা এরকম−তাদের ওপর নির্দেশ আছে দেশের প্রধান কয়েকটি পাইকারি বাজারে ও দশ-বারোটি মেট্রো শহরের খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রফতানি বন্ধ করতে হবে। তাদের মনিটরিং শাখা যখন পেঁয়াজের দামে সেই ঊর্ধ্বগতি রিপোর্ট করেছে, তখনই নিয়মমাফিক তারা সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাত্র। আর এটা আসলে একটা রুটিন পদক্ষেপ। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বিশেষত ভারত-বাংলাদেশের মতো দুটো দেশের সম্পর্ক যে এই আমলাতান্ত্রিক নিগড়ে বাঁধা পড়তে পারে না, দিল্লিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই বোধোদয়টা তখনও হয়নি।
এদিকে পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবিতে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকেই শুরু হয়ে যায় মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষিদের আন্দোলন। নাসিকের কাছে লাসালগাঁও মান্ডির সামনে তারা শুরু করে দেন অবস্থান বিক্ষোভ। রাজ্যের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও এনসিপি দলের নেতা শারদ পাওয়ার কৃষকদের দাবিকে সমর্থন জানান। তিনি বলেন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়ে আমরা পাকিস্তানের সুবিধা করে দিচ্ছি না তো?
সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ঢাকার দিক থেকেও প্রয়োগ করা হতে থাকে কূটনৈতিক চাপ। দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনৈতিক তৎপরতা তো প্রথম থেকেই চলছিল। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে একটি ‘কূটনৈতিক নোট’ পাঠিয়ে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। মুখ খোলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও।
এই সম্মিলিত চাপের মুখে ভারতকে যে একটা কিছু করতেই হবে, অন্তত বাংলাদেশের জন্য কিছু একটা ছাড় দিতে হবে, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এই পটভূমিতে রফতানি নিয়ে জট খুলতেই শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিল্লির উদ্যোগ ভবনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দফতরে ডিজিএফটি-র শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকরা।
শুক্রবার দিনভর সেই বৈঠকে আলোচনা হয় ভারতের ফেস সেভিং বা কূটনৈতিক মুখরক্ষা এখন কীভাবে হতে পারে, মূলত সেটা নিয়েই। তিন-চারদিনের মাথায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়াটা সম্ভব নয়, এটা বোঝাই যাচ্ছিল। নেপাল-শ্রীলঙ্কাকে বাইরে রেখে শুধু বাংলাদেশের জন্য কোনও আলাদা ব্যবস্থা করাও ছিল অসুবিধাজনক। এই পরিস্থিতিতে পরিত্রাণের পথ দেখায় বৈদেশিক বাণিজের ক্ষেত্রে ভারতের হ্যান্ডবুক অব প্রসিডিওরস (পদ্ধতি-সংক্রান্ত পুস্তিকা)।
ওই হ্যান্ডবুকের অনুচ্ছেদ ৯.১২ (বি)-তে লেখা আছে, যদি বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত নীতিমালা রফতানিকারকদের প্রতিকূলে সংশোধন করা হয়, তাহলে ওই তারিখের ভেতর যেসব চালান ইতোমধ্যেই শুল্ক বিভাগের কাছে পরিদর্শনের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে তার ওপর সেই সংশোধিত নীতিমালা প্রযোজ্য হবে না।
তবে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নিতে ভারত সরকারের আরও উঁচু পর্যায়ে বৈঠকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আভাস মিলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের মধ্যেও অচিরেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে এবং গত বছরের মতো বেশ কয়েক মাস নয়, এই নিষেধাজ্ঞা সম্ভবত কয়েক দিন বা বড়জোর কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না।
উল্লেখ্য, গত ১৪ই সেপ্টেম্বর সোমবার থেকে ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ফরেন ট্রেড এর এক চিঠিতে পূর্ব ঘোষনা ছাড়াই পেঁয়াজ রপ্তানীতে বন্ধ করে দেয়। ১৮ই সেপ্টেম্বর ওই ফরেন ট্রেড এর অপর এক চিঠিতে শর্ত সাপেক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি হবে বলে ভারতীয় সিএন্ডএফ সূত্রে জানানো হয়।