শুক্রবার ভোরে কুয়াশার চাদর ভেদ করে পূর্বাকাশে লাল সূর্যটি উঁকি দেবে সুন্দর আগামী বিনির্মাণের অভিপ্রায়ে। প্রত্যাশা করি, বিদায়ী বছরের হতাশা, কষ্ট, গ্লানি, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে সমৃদ্ধির পথে শুরু হোক নতুন বছরের নতুন অভিযাত্রা।
আমাদের সেই প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার জায়গা থেকে আমাদের উচিৎ পুরনো বছরসহ অতীতের পাপরাশির জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। সেই সঙ্গে নতুন বছরসহ ভবিষ্যতে পাপ না করার ও দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ব হয়ে দেশের জন্য ভাল এবং আল্লাহর পরিপূর্ন দ্বীন আনুগত্য করার মেনে চলার অঙ্গীকার
সময় আল্লাহর দান। সময়ের সমষ্টিই জীবন। প্রতি পলে মানবের বয়স বাড়ে, সঙ্গে সঙ্গে আয়ু কমে সমানতালে। তিল, পল, মুহূর্ত, দণ্ড, প্রহর, আহ্ন, দিবস, রজনী, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী ইত্যাদি মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহারোপযোগী সময়ের প্রাকৃতিক বিভিন্ন বিভাজন। আল্লাহপাক কোরআন করিমে ইরশাদ করেন: ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারোটি।’ (সুরা: ৯ তাওবা, আয়াত: ৩৬)।
কোরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: ‘তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং উহাদের মঞ্জিল নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বত্সর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এ সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন।’ (সুরা: ১০ ইউনুস, আয়াত: ৫)।
কোরআন হাকিমে মহান আল্লাহ আরও বলেন: ‘আর সূর্য ভ্রমণ করে উহার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, ইহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চন্দ্রের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মঞ্জিল; অবশেষে উহা শুষ্ক বক্র পুরোনো খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে।’ (সুরা: ৩৬ ইয়াসিন, আয়াত: ৩৮-৩৯)।
নতুন বছর আসা মানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হওয়া। নতুন বছর আসা মানে জীবনের নির্ধারিত আয়ু থেকে একটি বছর চলে যাওয়া। বিগত সময়ের ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন উদ্যমে নতুনের কেতন ওড়ানোর আনন্দ উপভোগ করা। অকল্যাণের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে অবারিত কল্যাণের
পথে ধাবিত হওয়ার শুভযাত্রা শুরু করা। নতুন মাস দিয়ে শুরু হয় নতুন বছর। নতুন মাসে সময়ের মালিকের কাছে এই আবেদন: ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমান, ওয়াছ ছালামাতি য়াল ইসলাম; রব্বি ওয়া রব্বুকাল্লাহ; হিলালু রুশদিন ওয়া খায়র।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আপনি এই মাসকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ইমান, প্রশান্তি ও ইসলাম–সহযোগে আনয়ন করুন; আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। এই মাস সুপথ ও কল্যাণের।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৫১, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪০০, রিয়াদুস সালিহীন, হাদিস: ১২৩৬)।
সময়ের সঙ্গে কোনো অমঙ্গল বা অকল্যাণের সংযোগ নেই। কল্যাণ-অকল্যাণ ও মঙ্গল-অমঙ্গল মানুষের কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাদিস শরিফে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা সময়কে দোষারোপ কোরো না, কালকে গালমন্দ কোরো না; কারণ, আমিই মহাকাল, আমিই সময়ের নিয়ন্তা। (হাদিসে কুদসি)।
ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর দাদা তাঁর পিতা ছাবিত (রহ.)–কে পারস্যের নওরোজের দিনে হজরত আলী (রা.)-এর নিকট নিয়ে গিয়েছিলেন এবং হজরত আলী (রা.)–কে কিছু হাদিয়া পেশ করেছিলেন। হাদিয়াটি ছিল নওরোজ উপলক্ষে। তখন হজরত আলী (রা.) বললেন, ‘নওরোজুনা কুল্লা ইয়াওম।’ অর্থাৎ মুমিনের নওরোজ প্রতিদিনই। মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব-নিকাশ করবে এবং নতুন উদ্যমে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে। (আখবারু আবি হানিফা রহ.)।
পুরোনো বছরের তথা অতীতের পাপরাশির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, সেই সঙ্গে নতুন বছরে পাপকাজ না করার এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বার্থে জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করা, আল্লাহর আনুগত্যের তৌফিক কামনা করা, দেশ ও সমগ্র মুসলিম জাতির সুখ-সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনায় আল্লাহর কাছে বিশেষ প্রার্থনা করা। আমিন।
লেখক: নুরুর রহমান, ইমাম ও খতিব– মসজিদুল উম্মাহ লুটন, সেক্রেটারি– শরীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোর্ড ও মিডল্যন্ড ইউকে। সত্যায়নকারী চেয়ারম্যান- নিকাহনামা সার্টিফিকেট ইউকে। প্রিন্সিপাল- আর রাহমান একাডেমি ইউকে, পরিচালক- আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে।