শীর্ষবিন্দু নিউজ, লন্ডন: দীর্ঘ ৪৮ বছর পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একক বাজার থেকে বেরিয়ে একা পথচলা শুরু করেছে সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক দেশ ব্রিটেন। নতুন বছর ২০২১ সালে নতুন যুগে পা রাখল দেশটি। এএফপি, রয়টার্স।
পরিবর্তনগুলোকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ব্রিটেনের স্বাধীনতা আমাদের হাতে। ভিন্নভাবে আরও ভালো কিছু করার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। অন্যদিকে যে চারটি স্বায়ত্তশাসিত স্টেট নিয়ে ব্রিটেন, তার অন্যতম স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলাস স্টারজিওন নতুন বছরের শুরুতে টুইট করেছেন: বাতি জ্বালিয়ে রাখ ইউরোপ। আমরা দ্রুত ফিরে আসব।
মুক্ত ও কোটা–ফ্রি বাণিজ্যের জন্য ইইউ ও ব্রিটেনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা ও দর কষাকষির পরও যে চুক্তি হয়েছে, তাতে উভয় পক্ষ কঠোর শুল্ক চেকের মধ্য দিয়ে যাবে আগামী দিনগুলোয়। নতুন যুগের প্রথমদিনে ব্রিটেনের সংবাদপত্রগুলোয় দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির খবর।
ব্রেক্সিটপন্থি ডেইলি এক্সপ্রেস আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের ব্রিটেন, আমাদের নিয়তি মূল শিরোনামে খবর ছেপেছে। তাতে আরও বেশি ব্রিটিশির প্রতীক হিসেবে জাতীয় পতাকায় ‘ফ্রিমড’ শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ইইউপন্থি ইনডিপেনডেন্টের অবস্থান সংশয়জনক। ঝুলে থাকা নাকি ভেসে যাওয়া শিরোনাম দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পত্রিকাটি।
এতে ইঙ্গিত করা হয়, যে পথ ব্রিটেন বেছে নিয়েছে তাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ২০২১–এর প্রথম ভোরে সবার বিশেষ নজর ছিল ব্রিটেনের সীমান্তের দিকে। বিশেষত প্রধান প্রধান চ্যানেল ও সমুদ্রবন্দরগুলোর দিকে। বিশ্লেষকরা লক্ষ করছিলেন বাণিজ্য ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবকিছু স্বাভাবিক গতিতে চলে, নাকি ঝামেলা তৈরি হয়। তবে বছরের প্রথমদিন ছুটি থাকায় চেকের ক্ষেত্রে তেমন ঝামেলা দেখা যায়নি।
ইউরো টানেলের মুখপাত্র জন কিফে বলেছেন, আগামী কয়েকদিনের ট্রাফিক হালকা থাকবে বলে পূর্বাভাস করা হয়েছে। শুক্রবার ভোরে ডোভার বন্দর দিয়ে প্রথম ট্রাক ছেড়ে যাওয়ার সময় প্রথমবারের মতো ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের দিকে যাওয়া ও আসার জন্য কিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়েছে।
ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য চালানোর জন্য বছরে ২২ কোটি নতুন ফরম দরকার হবে ব্রিটেনের। একে বিপ্লবী পরিবর্তন বলছেন রোড হ্যাউলেজ অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রড ম্যাকেঞ্জি। এ ছাড়া আরও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে ইইউর বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশদের হলিডে হাউসে ছুটি কাটাতে যাওয়া, ছাত্রদের পড়াশোনা ও চলাফেরার ক্ষেত্রে। কারণ, আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ স্টুডেন্ট প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেবে ব্রিটেন।
ব্রেক্সিটের পর এখন ব্রিটেনের তীব্র নজর থাকবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড সীমান্ত এবং স্কটল্যান্ডের ওপর। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে যাতে কোনো আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে চাইবে লন্ডন। ব্রিটিশ শাসন নিয়ে সহিংসতার কারণে ১৯৯৮ সালে সেখানে শান্তিচুক্তি করতে হয় ব্রিটেনকে।
অন্যদিকে ব্রিটেন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হতে চায় স্কটল্যান্ড। ২০১৪ সালে হওয়া এক গণভোটে মানুষ ব্রিটেনে থাকার রায় দিলেও ব্রেক্সিটের পর সেখানকার মানুষ ইউরোপের সঙ্গে থাকতে চায়। ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলাস স্টারজিওন আগেই বলেছেন, আবার গণভোটের আয়োজন করবেন। নতুন বছরের প্রথমদিনে ‘ইউরোপে ফিরে আসব’ টুইট করে তিনি সেদিকেই ইঙ্গিত করলেন।
ব্রেক্সিটের কারণে ব্যক্তিগত প্রাপ্তিতে বাধা তৈরি হয়েছে অনেক ব্রিটিশ নাগরিকের। এর মধ্যে আছেন খোদ ব্রেক্সিট নেতা প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বাবা স্ট্যানলি জনসনও। তিনি বলেছেন, ব্রিটেন ইউরোপ ছাড়ায় তিনি ব্রিটেন ছেড়ে ফরাসি নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করবেন।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে চলাফেরাসহ বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হতে হবে ব্রিটেন ও ইইউ সদস্যদেশগুলোর অনেক অধিবাসীকে। ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার কারণে ২০১৬ সাল থেকে ব্রিটিশ চ্যানেলের দুই পার তথা ব্রিটেন ও মূল ইউরোপ ভূখণ্ডে অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে। শেষ পর্যন্ত ব্রাসেলসের শাসন থেকে চুক্তিসহ বেরিয়ে আসতে পেরেছে ব্রিটেন। এর মধ্যদিয়ে ব্রিটেন ও ইইউর ২৭টি সদস্যদেশের ৫০ কোটির বেশি মানুষের মুক্ত চলাচলের সমাপ্তি ঘটল।