সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:০৪

ইদ্রিস (আঃ) এর জীবনী

ইদ্রিস (আঃ) এর জীবনী

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ১১৫৬
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয়ইদ্রিস (আঃ) এর জীবনী’ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান ‘ইসলাম থেকে’, বিভাগ প্রধান, শীর্ষবিন্দু নিউজ

ইদ্রিস (আঃ) সাঃ যিনি মুসলমানদের নিকট হযরত ইদ্রিস (আঃ)সাঃ নামে পরিচিত, ইসলামী ইতিহাস অণুসারে মানবজাতির উদ্দেশ্যে প্রেরিত দ্বিতীয় নবী। মুসলমানদের বিশ্বাস অণুসারে তিনি ইসলামের প্রথম নবী আদম এর পর স্রষ্টার নিকট হতে নবীত্ব লাভ করেন। তার জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারো মতে তিনি ইরাকের বাবেলে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কারো মতে তিনি মিশরে জন্মগ্রহণ করেন।

ইসলামী ভাষ্য মতে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ মিরাজের রাতে চতুর্থ আসমানে তার সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। ধারণা করা হয় তিনিই সর্বপ্রথম কলম এবং কাপড় সেলাই করার বিদ্যা আবিস্কার করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, অংকশাস্ত্র এবং অস্ত্রের ব্যবহারও তিনিই সর্বপ্রথম আবিস্কার করেন। ইদ্রীস (আঃ) সাঃ এর নাম ও বংশ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে বিরাট মতভেদ আছে।

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে ইসহাকের মতে, তিনি হলেন ইসলামের নবী নূহ এর দাদা। তার আসল নাম হলো আখনূখ। ইদ্রীস(আঃ)সাঃ তার উপাধি। কিংবা আরবি ভাষায় তার নাম ইদ্রীস (আঃ) সাঃ আর হিব্রু ও সুরইয়ানী ভাষায় তার নাম হলো আখনূখ। ইবনে ইসহাক তার বংশধারা বর্ণনা করেনঃ আখনূখ (ইদ্রীস) (আঃ) সাঃ ইবনে ইয়ারুদ ইবনে মাহলাইল। এভাবে তার বংশধারা আদম এর পুত্র শীষ এর সাথে মিলিত হয়। আরেকদল ঐতিহাসিকের মতে ইদ্রীস ইসরাইল বংশীয় নবী। আর ইদ্রীস(আঃ)সাঃ ও ইলয়াস একই ব্যক্তির নাম ও উপাধি।

তার জীবন সম্পর্কে যতোটুকু জানা যায়, তা হলো ছোটবয়সে তিনি শীষএর ছাত্র ছিলেন। বড় হওয়ার পর আল্লাহ তাকে নুবুওয়্যত দান করেন। তখন তিনি আদম এর ওপরে অবতীর্ণ শরীয়ত ত্যাগ করতে মন্দলোকদের নিষেধ করেন। অল্পকিছু লোক তার আহ্বানে সাড়া সৎপথে ফিরে আসলো। আর অধিকাংশ মানুষই তার বিরোধিতা করলো। তাই তিনি তার অণুসারীদের নিয়ে দেশ ছেড়ে যেতে মনস্থ করলেন। কিন্তু তার অণুসারীরা মাতৃভূমি ছাড়তে গড়িমসি করে বললো, বাবেলের মতো দেশ ছেড়ে গেলে এমন দেশ আর কোথায় পাব? উত্তরে তিনি বললেন যদি আমরা আল্লহর জন্য হিজরত করি তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে এরচে উত্তম প্রতিদান দেবেন।

এরপর তিনি নিজের অণুসারীদেরসহ দেশ ছেড়ে রওয়ানা হলেন এবং একসময় মিশরের নীলনদের তীরে এসে পৌঁছলেন। এ জায়গা দেখে তারা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন এবং এখানেই বসবাস করতে লাগলেন। তিনি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধে ব্রতি হন। কথিত আছে তার যুগে ৭২টি ভাষা ছিল এবং এর সবকটি ভাষাই তিনি পারতেন। ইদ্রীস (আঃ) সাঃ এর বয়স সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। বাইবেলের বর্ণনা অণুযায়ী ইদ্রীস (আঃ) সাঃ ৩৬৫ বছর জীবিত থাকেন। তবে আরেক বর্ণনানুযায়ী তিনি ৮২ বছর জীবিত থাকেন। তার মৃত্যুবরণ করা সম্পর্কেও মতভিন্নতা রয়েছে। কারো কারো মতে তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। বরং আল্লাহ তাকে চতুর্থ আসমানে তুলে নিয়েছেন। তবে বেহেস্তে থেকে যাওয়ার কাহিনী গুলো ইসরাঈলী বর্ণণা।

স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ:
এক আগন্তুক ব্যক্তি তিনদিন পর্যন্ত হযরত ইদরিস (আঃ) এর সাহচর্যে থাকলেন। তার আচরণাদি লক্ষ্য করে হযরত ইদরিস (আঃ)-এর মনে সন্দেহের উদ্রেক হলো যে, এ ব্যক্তি নিশ্চয় কোন মানুষ নয়। অতএব তিনি বললেন, আল্লাহর কসম আপনি আপনার প্রকৃত পরিচয়টা বলুন। আগন্তুক বলল, আমি কোন মানুষ নয়। আমি একজন ফেরেশতা। আমার নাম মালাকুল-মওত আজরাঈল।

হযরত ইদরিস (আঃ) বললেন, ‘আপনিই কি দুনিয়ার যাবতীয় প্রাণীর জান কবজ করিয়া থাকেন?’ মালাকুল-মওত বললেনঃ হাঁ।

হযরত ইদরিস (আঃ) বললেন, ‘তবে মনে হয় আপনি আমার জান কবজ করতেই এসেছেন’।

মালাকুল-মওত বললেন, ‘না, আপনার সাথে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করতে এসেছি। আমার একান্ত বাসনা আপনিও আমার এ প্রস্তাবে রাজী হবেন’।

হযরত ইদরিস (আঃ) বললেন, ‘আমি আপনার সাথে এক শর্তে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করতে রাজী যদি আপনি আমাকে একবার মৃত্যুর অবস্থাটা উপভোগ করান। যদি আপনি আমাকে এখনই একবার মৃত্যুর অবস্থাটা উপভোগ করান তাহলে আমার অনেক উপকার হতো। মৃত্যুর ভয়ে আমি বেশি করে আল্লাহর ইবাদত করতে পারতাম।’

মালাকুল-মওত বললেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া আমি একাজ করতে পারিনা। আল্লাহ এখনো আপনার জান কবজ করার হুকুম আমাকে দেননি।’

হযরত ইদরিস (আঃ) বললেন, ‘আপনি আল্লাহর নিকট হতে অনুমতি চেয়ে নিন।’

মালাকুল-মওত আল্লাহর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাঁকে অনুমতি দেন। অনুমতি পেয়ে মালাকুল-মওত হযরত ইদরিস (আঃ) এর জান কবজ করলেন। জান কবজ করার পর মালাকুল-মওত আজরাঈল (আঃ) পুনঃরায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন হযরত ইদরিস (আঃ) এর জান ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা কবুল করলেন।

অতঃপর ফেরেশতা আজরাঈল (আঃ) হযরত ইদরিস (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভাই ইদরিস! জান কবজ করার সময় আপনার কিরূপ লেগেছিল?’

হযরত ইদরিস (আঃ) বললেন, ‘কোন জীবিত প্রাণীর শরীরের চামড়া মাথা হতে পা পর্যন্ত খসে তুলে ফেললে প্রাণীটির যে রূপ কষ্ট হয় আমারও সেরূপ কষ্ট হয়েছে।’

মালাকুল-মওত বললেন, ‘ভাই ইদরিস! আমি আজ পর্যন্ত যত জান কবজ করেছি এত সহজে কারো জান কবজ করিনি।’

কৌশলে বেহেশতে গমন: হযরত ইদরিস (আঃ) হযরত আজরাঈল (আঃ) কে বললেন, ‘আমার মনে দোজখ দেখার খুব স্বাদ জেগেছে। যদি আপনি আমাকে দোজখ দেখাতেন তবে আমি দোজখের ভয়ে ইবাদত-বন্দেগীতে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারতাম।

মালাকুল-মওত তাঁকে দোজখ দেখাতে দোজখের দরজায় নিয়ে গেলেন। তিনি দোজখ দেখার পর বললেন, ‘ভাই আজরাঈল! আমার মনে বেহেশত দেখার বড়ই স্বাদ জেগেছে। যদি আপনি আমার এই স্বাদটি পূর্ণ করতেন তাহলে আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকতাম।’

মালাকুল-মওত বললেন, ‘যদি আপনি আমাকে কথা দেন যে বেহেশত দেখেই আপনি আমার নিকট ফিরে আসবেন তাহলে আমি আপনাকে বেহেশত দেখাতে পারি।’

হযরত ইদরিস (আঃ) তাতে রাজী হলে মালাকুল-মওত তাঁকে বেহেশত দেখাতে নিয়ে গেল। বেহেশতের দরজায় আসলে হযরত ইদরিস (আঃ) তাঁর পায়ের জুতা খুলে বেহেশতে প্রবেশ করলেন। তিনি কিছু সময় বেহেশতে ঘুরাফেরা করলেন। এরপর তিনি মালাকুল-মওতের কাছে ফিরে এসে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন। পরক্ষণেই তিনি এক দৌঁড়ে আবার বেহেশতে ঢুকে গেলেন। মালাকুল-মওত তাঁকে ডেকে বলল, ‘ভাই ইদরিস! আপনি আবার বেহেশতে ঢুকলেন কেন? তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসুন। আমি আপনাকে আবার পৃথিবীতে পৌঁছে দেব।’

হযরত ইদরিস (আঃ) বেহেশতের ভিতর থেকে জবাব দিলেন, ‘ভাই আজরাঈল! আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেনঃ প্রত্যেক প্রাণীই একবার মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে এবং একবার দোজখ না দেখে কেউ বেহেশতে যেতে পারবেনা। আমি তো একবার মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করলাম এবং দোজখও দেখলাম। তারপর বেহেশত হতে বের হয়ে আপনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করলাম। অতএব এখন আমি আর বেহেশত হতে বের হবো না। আপনি আপনার কাজে চলে যেতে পারেন।’

মালাকুল-মওত হযরত ইদরিস (আঃ) এর জবাব শুনে কর্তব্য স্থির করতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

আল্লাহ তা’আলা তখন হযরত আজরাঈল (আঃ) কে লক্ষ্য করে বললেনঃ আজরাঈল! ইদরিসকে বেহেশতে থাকতে দাও। তাঁর ভাগ্যে আমি এরূপ ঘটনায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলাম। অতঃপর হযরত ইদরিস (আঃ) মহাসুখে বেহেশতে বসবাস করতে লাগলেন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2021