মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০৬:০৯

হযরত দানিয়াল (আ.) এর জীবনী

হযরত দানিয়াল (আ.) এর জীবনী

ইমাম মাওলানা নুরুর রাহমান / ১৪৩
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২২

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয় ‘হযরত দানিয়াল (আ.) এর জীবনী’ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম মাওলানা নুরুর রাহমান

হযরত দানিয়াল (আ.) ছিলেন বনি ইসরাঈলের একজন নবী। তিনি সংগ্রামী, বিচক্ষণ ও কালজয়ী ব্যক্তি ছিলেন। ছিলেন বিপুল প্রতিভার অধিকারী। তার চরিত্র ছিল উন্নত ও অসাধারণ। দ্বীনি দাওয়াত ও সত্য প্রকাশে ছিলেন আপসহীন। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে হাজার হাজার লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। এজন্য তাকে বহু অত্যাচারও সইতে হয়েছে। বহু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ মোজেজাও প্রকাশ পেয়েছে তার কাছ থেকে। তার তুলনা তিনি নিজেই।

ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে পারস্য সম্রাট কুরেশের (সাইরাস) সময় তার জন্ম। তার জন্মের আগে সম্রাট এক ভয়াবহ স্বপ্ন দেখেন। যার ব্যাখ্যার জন্য রাজ্যের সব পন্ডিত, গণক ও স্বপ্নের ব্যাখ্যাতাকে সমবেত করেন। তারা বললেন, এ রাতেই একটি শিশুর জন্ম হবে, যে আপনার রাজত্ব ধ্বংস ও লন্ড ভন্ড করে দেবে। সম্রাট ওই রাতে জন্ম নেয়া সব শিশুকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। অসংখ্য শিশুকে হত্যাও করে। ওই রাতেই জন্ম নেয়া শিশু দানিয়াল। প্রাণে বেঁচে যান তিনি। তাকে সম্রাটের সামনে আনা হলে তার দিকে চেয়ে সম্রাটের মায়া হয়। তাকে আর হত্যা করতে পারেননি। তবে গহিন বনে ফেলে দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। যে বনে ছিল পশুরাজ সিংহের বসবাস। তার ধারণা, সিংহ শিশুটিকে খেয়ে ফেলবে। এদিকে শিশুটিকে খুঁজতে খুঁজতে তার মা ওই বনে চলে আসেন। দেখতে পান, দুটি সিংহ শিশুকে জিহ্বা দিয়ে আদর করছে। তার মা শিশুর কাছে গেলে সিংহ দুটি সরে যায়। মা শিশুকে বুকে জড়িয়ে নেন। আদর করেন। বুকের দুধ পান করান।

শৈশবকালেই তিনি ছিলেন বিচক্ষণ। তার বিচক্ষণতা সম্পর্কে হযরত আলী (রা.) একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণনা করেছেন, ‘বনি ইসরাঈল সম্প্রদায়ে দুজন বিচারক ছিলেন। তাদের ছিল একজন নিষ্ঠাবান বন্ধু। সে বন্ধুর স্ত্রী ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। এ সময় বাদশাহর একটি কাজ সম্পাদনের জন্য একজন নিষ্ঠাবান লোকের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লোক হাজির করার নির্দেশ দেন। বিচারকদ্বয় তাদের সে নিষ্ঠাবান বন্ধুকে ওই কাজে পাঠিয়ে দেন। লোকটি বাইরে চলে যাওয়ার সময় তার স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি রাখার অনুরোধ জানায়। বিশ্বাসঘাতক বিচারকদ্বয় অশুভ স্বার্থ হাসিলের জন্য ওই বাসায় হানা দিয়ে মহিলাকে অবৈধ প্রস্তাবে চাপ প্রয়োগ করে। মহিলা সম্মত না হওয়ায় তাকে ধমক দিয়ে বলে, তুমি রাজি না হলে অবৈধ কাজের অভিযোগ এনে তোমাকে পাথর মারার নির্দেশ দেয়া হবে। মহিলার জবাব, যাচ্ছেতাই করো, তবুও এ গর্হিত কাজে আমি রাজি নই। অতঃপর বিচারকদ্বয় বাদশাহর কাছে গিয়ে অভিযোগ করে, ওই স্ত্রীলোকটি অবৈধ কাজে লিপ্ত হয়েছে। আমরা সাক্ষী দিচ্ছি, তাকে পাথর মেরে শেষ করতে হবে।

এ ঘটনায় বাদশাহ বিস্মিত হলেন। উজিরকে বললেন, দ্রুত সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করো। উজির রাজদরবারে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে একটি বালক দেখতে পান। যার নাম দানিয়াল। উজির দানিয়ালকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। দানিয়াল তার প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতায় দুজনকেই মিথ্যুক হিসেবে সাব্যস্ত করেন। উজিরকে বলেন, মানুষকে জানিয়ে দিন এ দুই ব্যক্তি সতী নারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে, এ অপরাধে তাদের হত্যা করা হবে। এ ঘটনা উজির বাদশাহকে জানালেন। বাদশাহ ঠিক একই কায়দায় তরবারি হাতে বিচারকদের জবানবন্দি নিয়ে দেখতে পেলেন, উভয়ই মিথ্যাবাদী। তারপর সারা দেশে জানিয়ে দিলেন, স্ত্রীলোকটি নির্দোষ, বিচারকদ্বয়ই মিথ্যাবাদী। এরপর হাজার হাজার জনতার সামনে ওই দুই বিচারককে হত্যা করা হয়।

দানিয়াল (আ.) যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন ব্যবিলন ও পারস্য সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন সম্রাট ‘লাহরাসব’। বখতে নসর ছিলেন দজলা নদীর পশ্চিম তীর এবং আহওয়াজ থেকে রোম পর্যন্ত বিশাল এলাকার সেনাপতি। তিনি লাহরাসবের মৃত্যুর পর নিজের শাসন ক্ষমতা বাড়ানোর অভিযান শুরু করেন। বায়তুল মোকাদ্দাসে অভিযান চালিয়ে শহরটি দখল করে যোদ্ধাদের হত্যা এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করেন। বন্দি শিশু-কিশোরদের ব্যবিলনে এনে তাদের সঙ্গে ক্রীতদাসের আচরণ করা হয়। প্রতিভা বিচক্ষণতা দেখে যে চারজন কিশোরকে বিশেষ যত্নের সঙ্গে লালন-পালনের নির্দেশ দেন তাদের অন্যতম দানিয়াল। দানিয়াল তার উন্নত চরিত্র ও অসাধারণ প্রতিভার মাধ্যমে অল্প সময়েই গণমানুষের মনে স্থান করে নিতে সক্ষম হন। এতে বখতে নসর মিসর-মরক্কোসহ বিশাল এলাকা করায়ত্ত করার সুযোগ পান। ফলে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে দানিয়াল দুশমনের হাত থেকে বেঁচে যান।

এরপর শুরু হয় তার দাওয়াতি কার্যক্রম। এতে চতুর্দিক থেকে তিনি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। তিনি প্রবল বাধা উপেক্ষা করেও এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য মানুষকে আহ্বান জানাতে থাকেন। কোনো কিছুতেই দ্বীনের দাওয়াত থেকে বিরত থাকেননি। এতে বখতে নসর ভীষণ রাগান্বিত হয়ে তাকে জেলখানায় আটক করেন। হজরত দানিয়াল জেলখানায় থাকাবস্থায় সম্রাট বখতে নসর স্বপ্নে এমন একটি বড় মূর্তি দেখেন, যার পা ছিল পোড়ামাটির, ঊরু ছিল তামার, পেট রুপার, বক্ষ সোনার, মাথা ও ঘাড় লোহার। এ মূর্তির দিকে তাকাতেই আকাশ থেকে একটি পাথর এসে মূর্তিটি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। বাদশাহ এ স্বপ্নের সঠিক তাবির বের করার জন্য সাম্রাজ্যের সব জ্ঞানী-গুণী ও স্বপ্নের ব্যাখ্যাতাকে নির্দেশ দেন। কেউই সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারেনি। উজির দানিয়ালের পান্ডিত্য ও জ্ঞান-গরিমার কথা জানতেন। সম্রাটের কাছে প্রস্তাব করা হলে দানিয়ালকে হাজির করা হয়। হযরত দানিয়াল এ স্বপ্নের তাবির করে বলেন, যে মূর্তি দেখেছেন তা হলো রাজত্ব পরিচালনার ক্রমধারা। প্রথম বাদশাহ ছিলেন পোড়ামাটির মতো নরম ও অলস শ্রেণীর। পরেরজন ছিলেন তামার মতো ও শক্তিধর। তার পরেরজন রুপার মতো সম্মানের অধিকারী। শেষজনের ছিল সোনালি রাজত্ব। এরপর শুরু হয় আপনার লৌহ শাসন- যা সবচেয়ে বিস্তৃত ও শক্তিশালী। আর আকাশ থেকে পাথর খন্ড অবতীর্ণ হয়ে মূর্তিটির সবকিছু চুরমার করে দেয়ার অর্থ হলো একজন নবী আসবেন-যিনি এসব রাজত্ব ভেঙে চুরমার করে দেবেন। স্বপ্নের তাবিরবিদ্যার জন্য দানিয়াল (আ.) বাদশাহর কাছে সম্মানের পাত্র হলেন।

হযরত ওমর (রা.) এর সময় আবু মুসা আশআরি (রা.) গুশ এলাকার দায়িত্ব পেলেন। সে সময় তিনি হযরত দানিয়াল (আ.) এর লাশের সিন্দুকের সন্ধান পান। তিনি খলিফার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার লাশ দাফন করেন। তবে বর্তমান মাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নামফলকে লেখা আছে, হযরত আলী (রা.) হজরত দানিয়াল (আ.) এর পবিত্র লাশ নদীর ভাঙনে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সিন্দুক থেকে বের করে আনেন। বরকতের জন্য জানাজার নামাজ পড়ে পুনরায় দাফন করেন। তখনও তার পুরো শরীর ছিল অক্ষত। ইরানের খুজিস্তান প্রদেশের গুশদানিয়াল শহরে তার সে পবিত্র মাজার অবস্থিত।

লেখক: ইমাম মাওলানা নুরুর রাহমান

  • ইসলাম বিভাগ প্রধানশীর্ষবিন্দু নিউজ
  • ইমাম খতিবমসজিদুল উম্মাহ লুটন
  • সেক্রেটারিশরীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোর্ড মিডল্যন্ড ইউকে
  • সত্যায়নকারী চেয়ারম্যাননিকাহনামা সার্টিফিকেট ইউকে
  • প্রিন্সিপালআর রাহমান একাডেমি ইউকে
  • পরিচালকআররাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2021