বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ০৭:২৫

ব্রিটেনে শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষার টি‌কে থাকার সংগ্রাম

ব্রিটেনে শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষার টি‌কে থাকার সংগ্রাম

ব্রিটে‌নের মূলধারার শিক্ষাব‌্যবস্থায় এসএস‌সির পরীক্ষায় বাংলা ঐচ্ছিক বিষয় হি‌সে‌বে নেবার সু‌যোগ রয়েছে। তারপরও ক্রমেই কম‌ছে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহী অংশগ্রহণকারী‌দের সংখ‌্যা।

একই সঙ্গে গত দুই দশ‌কে ব্রিটে‌নে জন্ম ও বড় হওয়া ব্রিটিশ বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলায় লিখতে পারা তো দূরের কথা বাংলা পড়‌তে পারা‌দের সংখ‌্যাও কম‌েছে আশঙ্কাজনক হা‌রে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলাফল বলছে, যুক্তরাজ্যে ভাষা শিক্ষার সুযোগ থেকে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রছাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যে সমস্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিদেশি ভাষাকে আবশ্যিক না রেখে ঐচ্ছিক হিসেবে রাখা হয়েছে, সেই স্কুলগুলোতেই ওই বিষয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেশি সংখ্যায় পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা।

৬১৫টি সরকারি স্কুলের ওপর পরিচালিত কেমব্রিজের গবেষণায় শিক্ষাগত বৈষম্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। যেসব স্কুলে জিসিএসই ভাষা ঐচ্ছিক ছিল, সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর গড় হার ছিল ২৯ শতাংশ।

যেসব স্কুলে ভাষাকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছিল, সেখানে এই হার ছিল ২১.৩ শতাংশ। ৭ শতাংশের এই ব্যবধানটি সমাজে শ্রেণীগত বিভেদকেই চিহ্নিত করে।

এই ব্যবধানের সরাসরি ফল দেখা যায় ভাষা গ্রহণে অংশগ্রহণের হারে। ‘আবশ্যিক’ ভাষার স্কুলগুলোতে যেখানে ৮২.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ভাষা নিয়েছিল, সেখানে ‘ঐচ্ছিক’ স্কুলগুলোতে তা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৩১.৯ শতাংশে নেমে আসে।

এই তথ্য প্রমাণ করে যে ২০০৪ সালে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়াটা সবার জন্য সম-সুযোগ তৈরি করেনি। বরং এটি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের স্কুলগুলোকে এই বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ দিয়েছে।

ইংল্যান্ডে ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে যে জাতীয় সংকট তৈরি হয়েছে— যেখানে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যোগ্য শিক্ষার্থীদের মাত্র ৪৫.৭ শতাংশ জিসিএসই-তে একটি ভাষা নিয়েছিল (ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৯৮ শতাংশের তুলনায় যা অত্যন্ত কম)—তার মূলে রয়েছে সমাজের গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্য।

এই জাতীয় প্রবণতা সরাসরি কমিউনিটি ভাষাগুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে, যা বহুভাষিক শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ভাষাগত সম্পদকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অপরিহার্য। বাংলা ভাষা জিসিএসইতে টিকে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

কেমব্রিজের ফ্যাকাল্টি অফ এডুকেশনের সহযোগী অধ্যাপক ড. কারেন ফোর্বস বলেন, সকল শিশুর ভাষা শেখার সমান সুযোগ থাকা উচিত এবং ঐচ্ছিক মর্যাদা এই বিষয়টিকে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে বার্তা দেয়।

তিনি যুক্তি দেন যে বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষার একটি বিস্তৃত সুযোগ তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে এবং সামগ্রিক জিসিএসই ভাষা স্কোরও ভালো হবে।

ড. ফোর্বসের চূড়ান্ত আহ্বান হলো, সকল স্কুলে জিসিএসইতে ভাষাকে আবার আবশ্যিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

একসময় বাংলা ভাষা শেখা‌তে বাংলা‌দেশ থে‌কে শিক্ষকরা এদেশে এসেছিলেন। ত‌বে সেই সময় এখন সুদূর অতীত। এখন এদেশে যারা জিসিএসইতে বাংলা নি‌চ্ছেন তারা মূলত মা বাবার আগ্রহে নিচ্ছেন। কারণ ফরাসি, জার্মান বা স্প্যানিশ ভাষা শি‌খে কা‌জে লাগা‌নোর সু‌যোগ থা‌কে। কিন্তু বাংলা শি‌খে এখানকার প্রেক্ষাপ‌টে কাজে লাগা‌নোর সু‌যোগ না থাকাও অনাগ্রহের বড় কারণ।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সামগ্রিক জিসিএসই ফলাফলে গত দুই দশকে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ সমকক্ষদের চেয়ে ভালো করে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে।

এই সাফল্য সত্ত্বেও, স্কুলের পাঠ্যক্রমে কমিউনিটি ভাষাগুলোর পদ্ধতিগত প্রান্তিকতা বজায় থাকায় তাদের এই মূল্যবান ভাষাগত সম্পদ প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026