ঈমান কেবল নামাজ বা রোযার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঈমান মানে হলো—আমরা কেমন আচরণ করি, অন্যদের কতটা সম্মান করি, এবং আল্লাহ আমাদের উপর যে অধিকারগুলো দিয়েছেন, সেগুলো কতটা গুরুত্বের সাথে পালন করি।
এই অধিকারগুলো একা নয়—এগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িত একটি বৃত্ত বা অবিচ্ছন্ন চক্রের মতো। শুরু হয় নিজের আত্মা থেকে, তারপর পরিবারে, আত্মীয়স্বজনের দিকে, তারপর বৃহত্তর মুসলিম সমাজে—এবং তারও বাইরে ছড়িয়ে পড়ে।
রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “এক মুসলমান, অপর মুসলমানের ভাই।” এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটিই পুরো বিষয়ের মূল।
অধিকার রক্ষা ও সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা- কেবল কথার কথা নয়। রাসুল (সা:) তাঁর জীবনে তা বাস্তবভাবে দেখিয়েছেন । তাঁর জীবনের শেষ দিকের এক যুদ্ধ ছিল হুনায়নের যুদ্ধ।
এটি ছিলো এক কঠিন যুদ্ধ। মুসলমানদের সংখ্যা বেশি থাকা সত্ত্বেও শুরুতে তারা কিছুটা পিছু হটে যায়। পরে আল্লাহ তাদের বিজয় দান করেন।
যুদ্ধের পরে রাসুল (সা:) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন শুরু করেন। তিনি উল্লেখযোগ্যভাবে নতুন মুসলমানদের অনেক বেশি অংশ দেন।
এতে আনসারদের (মদিনার সাহাবিরা) মনে কিছু কষ্ট জন্মায়। তারা ভাবতে লাগলেন, “আমরা তো শুরু থেকেই সাথে ছিলাম—তাহলে আমাদের তাদের চেয়ে কেন কম দেওয়া হলো? আমাদের অবদানের কথা কি ভুলে যাওয়া হচ্ছে।
রাসুল (সা:) তাদের এই কথাগুলো শুনে নীরব থাকেননি। তিনি সবাইকে একত্র করলেন, কোমলভাবে, সহানুভূতির সাথে বললেন—“তোমরা কি পথহারা ছিলে না, আর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের পথ দেখাননি? তোমরা কি দরিদ্র ছিলে না, আর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের সম্পদ দান করেননি?”
তারা বলল, “হ্যাঁ, তাই তো।” তারপর রাসুল (সা:) কিছু কথা বললেন, যা তাদের সমস্ত অভিযোগ মুছে দিল।
তিনি বললেন “তোমরা কি খুশি নও যে অন্যরা ভেড়া ও উট নিয়ে বাড়ি ফিরছে, আর তোমরা ফিরছ আল্লাহর রাসুলকে (সা:) সঙ্গে নিয়ে?”
এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়, মনের ভেতরে মাঝে মাঝে ক্ষোভ আসতে পারে, কিন্তু তা সারানো শুরু করতে হবে নিজের ভেতর থেকেই। এবং সেটাই প্রথম বৃত্ত। নিজেকে ঠিক করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর।” (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৬)
আল্লাহ প্রথমেই নিজেকে ঠিক করতে বলেছেন—অন্যদের নয়। কারণ ইসলামী সংস্কার শুরু হয় অন্তর থেকে।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “তোমরা কি মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দাও, অথচ নিজেদের ভুলে যাও?” (সূরা আল-বাকারা, ২:৪৪)।
এটি সেই ভণ্ডামির সতর্কতা, যেখানে মানুষ অন্যকে ঠিক করতে চায় কিন্তু নিজেকে ঠিক করে না।
যে ব্যক্তি সত্যিই নিজের অন্তরকে ঠিক করতে চায়, তার অন্যতম লক্ষণ হলো—অন্যদের প্রতিও তার চিন্তা জন্মায়।
নিজেকে আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা করার অংশ হলো—অন্যকে উপদেশ দেওয়া, সাহায্য করা, সৎ পথে ডাকা।
নিজের যত্ন নেওয়া মানে শুধু পাপ থেকে দূরে থাকা নয়—বরং নিজের প্রয়োজন মেটানো, জ্ঞান অর্জন করা, মানসিক ও আত্মিকভাবে সুস্থ থাকা—এসবও নিজের ওপর নিজের অধিকার।
এরপর আসে দ্বিতীয় বৃত্ত-পরিবার। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে পরিবারের মূল্য অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইসলাম পরিবারকেই কেন্দ্রে রেখেছে।
রাসুল (সা:)-এর জীবনে ওহি নাজিল হওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা তোমাদের পিতামাতার প্রতি ‘উফ’ বলো না।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩)
এখানে শুধু “উফ” শব্দটি বোঝানো হয়নি—যে কোনো রকম বিরক্তির প্রকাশকেই নিষেধ করা হয়েছে। আর এটিই সর্বনিম্ন পর্যায়ের আদব।
পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া, অবহেলা করা, তাদের পরিত্যাগ করা—এগুলো অনেক বড় গুনাহ।
তবে অধিকার একমুখী নয়—পিতা-মাতার যেমন অধিকার আছে, তেমনি সন্তানের প্রতিও তাদের দায়িত্ব আছে।
তাদের নামাজ শেখানো, কুরআন শেখানো, আল্লাহকে ভালোবাসতে শেখানো—এসব ফরজ দায়িত্ব। যদি আমাদের ভেতরে এই চেতনা না থাকে, তাহলে আমাদের সন্তানদের মধ্যে তা কীভাবে জন্ম নেবে?
এরপর আসে তৃতীয় বৃত্ত: আত্মীয়স্বজন।
রাসুল (সা:) বলেছেন: “যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” অতএব, আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, দেখা করা, খবর রাখা—এগুলো কেবল সংস্কৃতি নয়, বরং আমাদের দ্বীনের অংশ।
এরপর আসে চতুর্থ বৃত্ত: পুরো উম্মাহ।
রাসুল (সা:) বলেছেন, এক মুসলমান তার ভাইয়ের জন্য আয়না স্বরুপ। আয়না যেমন বাস্তব রূপই দেখায়, অতিরঞ্জন বা বিচার ছাড়া—তেমনি একজন মুমিনও তার ভাইয়ের ভুলকে সত্যভাবে তুলে ধরে, যাতে ভুল সংশোধন করা যায়।
আরেকটি হাদীসে রাসুল (সা:) বলেছেন: “একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের জন্য সেই হাতের মতো, যা অন্য হাতকে ধুয়ে দেয়।
ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে হিংসা, ঘৃণা ও সন্দেহ দূর করার মাধ্যমে।
এসব অনুভূতি আসতেই পারে, কিন্তু ইসলাম আমাদের এ কথা শেখায় সেগুলোকে অন্তরে স্থায়ী হতে দিও না।
দোয়া করো, ঘনিষ্ঠ হও, দূরে নয়—কাছে আসো।
এই প্রক্রিয়ায় পরামর্শ দেওয়া দ্বীনের অংশ।
রাসুল (সা:) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দের কথা হলো—যখন কেউ তার ভাইকে বলে ‘আল্লাহকে ভয় কর’, আর সে বলে, ‘আমার ব্যাপারে মাথা ঘামিও না।’” কারণ বাস্তবে, আল্লাহ আমাদের একে অপরের ব্যাপারে দায়িত্বশীল করেছেন।
রাসুল (সা:) বলেছেন, আল্লাহর বান্দা হও, এবং ভাই ভাই হয়ে যাও। যখন আমরা নিজেদের অন্তর পরিশুদ্ধ করি, অন্যের অধিকার রক্ষা করি, একে অপরকে সাহায্য করি—তখন আল্লাহ ঐক্য দান করেন। ঐক্যের মাধ্যমেই আসে বিজয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, বিশ্বাসীদের সাহায্য করা আমাদের ওপর অবধারিত। (সূরা আর-রূম, ৩০:৪৭)
অতএব, ঈর্ষা ত্যাগ করা, সৎ উপদেশ দেওয়া—এসব ছোট কাজ মনে হলেও, আসলে এগুলো আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার অংশ।
হে আল্লাহ! আমাদের এমন বানিয়ে দাও, যারা নিজেদের অধিকার থেকে শুরু করে, পিতা-মাতা, পরিবার ও পুরো উম্মাহর অধিকার রক্ষা করে। হে আল্লাহ! আমাদের অন্তর থেকে হিংসা, ঘৃণা ও স্বার্থপরতা দূর করে দাও। আন্তরিকতা, ভ্রাতৃত্ব ও রহমত দান করো। এবং আমাদের যেন কখনো অবহেলাকারী বা অত্যাচারীদের প্রতি উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত করো না। আমীন।
শায়েখ রাশিদ খান: অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার। ৩১ অক্টোবর ২০২৫।
Leave a Reply