বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:৫৮

বাড়ির মালিকানা নিয়ে বৈষম্যের ফাঁদে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি

বাড়ির মালিকানা নিয়ে বৈষম্যের ফাঁদে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি

স্টার্লিং বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণা তুলে ধরেছে, কাঠামোগত বৈষম্য অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিবারকে বাড়ির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করছে।

ব্রিটেনে নিজের একটি বাড়ি কেনার স্বপ্ন এখন অনেক প্রবাসীর জন্য কেবল দূরের কল্পনা। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা আরও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, আবাসন সংকট ও উচ্চ সুদের হার, বাড়ি ভাড়ার চাপ সবার ওপর সমানভাবে প্রভাব ফেলছে না।

জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং শেফিল্ড হালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পরিচালিত একটি গবেষণা বলছে, যুক্তরাজ্যে বাড়ির মালিকানা কমে যাওয়া শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতিগত সমস্যা হিসাবেও দেখা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন দ্বিমুখী সংকট-এর মুখোমুখি। একদিকে তারা যেখানে বসবাস করছেন তার ভৌগোলিক অবস্থান, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য তাদের বাড়ি কেনার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনে ‘বিএএমই’ (কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয় ও সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী) তকমার আড়ালে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা অজানা থাকতো। নতুন গবেষণা সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বৈষম্যের বিশাল ফারাক। যেখানে ৬৮ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ পরিবার এবং ৭৪ শতাংশ ভারতীয় পরিবার নিজেদের বাড়ির মালিকানা নিশ্চিত করেছে, সেখানে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যে এই হার মাত্র ৪৬ শতাংশ।

পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের তুলনায় বাংলাদেশিরা ২২ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে আছেন। পাকিস্তানি পরিবারগুলোর মালিকানার হার ৫৮ শতাংশ হলেও, বাংলাদেশিরা তার চেয়ে অনেক নিচে রয়েছেন।

নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রায়ই বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি কমিউনিটিকে এক কাতারে ফেলা হয়, কিন্তু এই ব্যবধান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বাংলাদেশিরা ভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

গবেষণায় ভৌগোলিক অবস্থানের নিষ্ঠুর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো ইনার লন্ডনের বরো-গুলোতে বসবাস করেন। মিডলল্যান্ডস বা উত্তর ইংল্যান্ডের (যেখানে অন্যান্য এশীয় অভিবাসীরা বেশি থাকেন) তুলনায় এসব এলাকায় আয়ের সঙ্গে বাড়ির দামের ব্যবধান আকাশচুম্বী।

স্টার্লিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সায়েন্স অনুষদের ড. রেজিনা সার্বা জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশিরা কেবল বাড়ি কিনতে অক্ষম, এমন ধারণা সঠিক নয়। তারা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে ছিটকে পড়ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ঋণ বা মর্গেজ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা পিছিয়ে।

অনেকের জন্য প্রচলিত মর্গেজ বাজার যেন একটি ‘বন্ধ দরজা’। সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ফেইথ পেনাল্টি’, অর্থাৎ ধর্মীয় কারণে বাড়তি খরচ। মুসলিম ক্রেতাদের জন্য শরিয়াহসম্মত আর্থিক পণ্য সীমিত এবং প্রচলিত মর্গেজের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

এছাড়া কমিউনিটির অনেকের আয় আসে ‘গিগ ইকোনমি’ বা অস্থায়ী কাজ এবং যৌথ পারিবারিক আয়ের মাধ্যমে, যা ব্রিটেনের প্রধান ব্যাংকগুলোর ঋণের ক্রেডিট স্কোরিংয়ে নেতিবাচক হিসেবে ধরা হয়।

সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশের এই নিম্ন মালিকানা হারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ ‘ওভারক্রাউডিং’ হারের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। শ্বেতাঙ্গ মিলেনিয়ালরা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকলে সেটাকে যেভাবে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখা হয়, বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি তা নয়। এখানে যৌথ পরিবারে বসবাস অনেক সময় অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও আবাসন সংকট থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি কেবল আবাসন সরবরাহ না বাড়িয়ে জাতিগত বাধার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই বৈষম্য আগামী প্রজন্মের মধ্যেও শেকড় গাড়বে। এতে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আরও বাড়বে এবং সামাজিক সক্রিয়তা চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ড. সার্বার উপসংহার নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির মতো গোষ্ঠীগুলো যেসব প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার, সরকার যদি তা সমাধান না করে, তবে যুক্তরাজ্যের আবাসন বাজার স্থিতিশীলতার ভিত্তি না হয়ে বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যাবে।

উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে চালু হওয়া ‘রাইট টু বাই’ নীতিকে ব্রিটেনে বাড়ির মালিকানা সহজ করার হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য এই নীতিটি মই হওয়ার বদলে একটি ‘ফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নীতির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর হাতে সম্পদ নয়, বরং ঝুঁকি তুলে দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অনেক বাংলাদেশি পরিবার শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এবং নিম্নমানের কাউন্সিল এস্টেটে বসবাস করত।

এসব বাড়ি কিনলেও শহরতলির সেমি-ডিটাচড বাড়িগুলোর মতো এগুলোর দাম বাড়েনি। উল্টো, অনেক পরিবার এমন সব বাড়ির মালিক হয়েছে যেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন এবং আকাশচুম্বী ‘সার্ভিস চার্জ’ বা সেবা মাশুল তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বাড়ি কিনতে না পারার প্রভাব কেবল ব্যাংক ব্যালেন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর ফলে বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিবার চড়া মূল্যের ভাড়াবাসায় (প্রাইভেট রেন্টাল সেক্টর) থাকতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে থাকার কোনো দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা নেই। এটি সরাসরি ‘ওভারক্রাউডিং’ বা গাদাগাদি করে বসবাসের সংকট তৈরি করেছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2025