মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৪

যুক্তরাজ্যের অভিবাসনের কঠোর শর্ত এখন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে

যুক্তরাজ্যের অভিবাসনের কঠোর শর্ত এখন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে

যুক্তরাজ্য এক কঠোর অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিনের প্রচলিত পাঁচ বছরে স্থায়ী বসবাস (আইএলআর) পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ নীতি চালু করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে স্কিলড মাইগ্র্যান্টস অ্যালায়েন্স (এসএমএ) এবং শীর্ষ আইনজীবীদের জোট আইনি যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিয়েছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নেতৃত্বে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ এখন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এতে হোম অফিস মাসের পর মাস আইনি জটিলতায় আটকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যে আসা হাজার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী, যারা পাঁচ বছর পর স্থায়ী হওয়ার প্রত্যাশায় ছিলেন, তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

সরকারের যুক্তি, ব্রিটেনে বসবাসের সুযোগ ‘অর্জিত’ হতে হবে, স্বয়ংক্রিয় নয়। কিন্তু আইনি চ্যালেঞ্জকারীরা বলছেন, যারা নির্দিষ্ট ভিসার শর্ত মেনে এসেছেন, তাদের ক্ষেত্রে হঠাৎ নিয়ম পরিবর্তন ‘বৈধ প্রত্যাশার’ লঙ্ঘন।

চলতি শরতে পার্লামেন্টে চূড়ান্ত নীতিমালা পেশের সময় ‘জুডিশিয়াল রিভিউ’র আবেদন করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। আইনি লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু প্রস্তাবিত সংস্কারের ‘পেছনের তারিখ থেকে কার্যকারিতা’।

নতুন কাঠামোয় ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যারা পাঁচ বছরে স্থায়ী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এসেছিলেন, তাদের সময়সীমা হঠাৎ ১০ বছর করা হচ্ছে। প্রায় ২০ লাখের বেশি অভিবাসী এই নিয়মের আওতায় পড়তে পারেন।

মানবাধিকার বিষয়ক প্রখ্যাত ব্যারিস্টার সোনালী নায়েক কেসির নেতৃত্বে আইনি সংস্থা কিংসলে ন্যাপলি ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রাক-আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। তাদের যুক্তি, রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘চুক্তিভিত্তিক’ সম্পর্কে আবদ্ধ অভিবাসীদের শর্ত হঠাৎ পরিবর্তন করা যায় না।

হোম অফিস যদি বর্তমান অভিবাসীদের জন্য ‘সংক্রমণকালীন সুরক্ষা’ দিতে অস্বীকার করে, তাহলে এসএমএ হাইকোর্টে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ চাইবে। এতে ১০ বছরের নিয়ম কার্যকর প্রক্রিয়া ঝুলে যেতে পারে।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টে জুডিশিয়াল রিভিউ সম্পন্ন হতে ৬ থেকে ৯ মাস লাগতে পারে। বিষয়টি সাংবিধানিক ও নীতিগত হওয়ায় রায় আপিল বিভাগ হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আদালত সরকারের ভবিষ্যৎ নীতি পরিবর্তনের অধিকার কেড়ে নেবে না, তবে ইতোমধ্যে অবস্থানরতদের ক্ষেত্রে ১০ বছরের নিয়মকে মানবাধিকারের অনুচ্ছেদ ৮ (ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অধিকার) লঙ্ঘন হিসেবে দেখতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এখন দ্বিমুখী চাপে রয়েছেন। জনমত জরিপে ৭৪ শতাংশ ভোটার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতায় আস্থা হারিয়েছেন। অন্যদিকে লেবার পার্টির অভ্যন্তরে সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারসহ বামপন্থিরা এই উদ্যোগকে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ ও ‘অ-ব্রিটিশ’ বলে সমালোচনা করেছেন।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আদালত যদি নীতিতে স্থগিতাদেশ দেয়, তাহলে জনকল্যাণমূলক ব্যয় কমিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয়ের পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। ফলে হাজার হাজার স্থায়ী বসবাসের আবেদন ঝুলে যাবে এবং হোম অফিস বড় জটিলতায় পড়বে।

চূড়ান্ত নীতিমালায় হোম অফিস স্থায়ী বসবাসের ‘মূল্য’ নির্ধারণ করেছে করযোগ্য আয় ও পেশাগত মর্যাদার ভিত্তিতে। গ্লোবাল ট্যালেন্ট ও ইনোভেটর ভিসাধারীদের জন্য ৩ বছরের দ্রুত পথ বহাল রয়েছে।

উচ্চ আয়ের পেশাজীবী (১ লাখ ২৫ হাজার ১৪০ ব্রিটিশ পাউন্ডের বেশি) ৩ বছরে, মধ্যম আয়ের (৫০ হাজার ২৭০ পাউন্ডের বেশি) ও এনএইচএস কর্মীরা ৫ বছরে স্থায়ী হতে পারবেন। সাধারণ দক্ষ কর্মীদের জন্য সময়সীমা ১০ বছর এবং কিছু ক্ষেত্রে ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

সব আবেদনকারীকে এখন থেকে বি-২ স্তরের ইংরেজি দক্ষতা ও টানা তিন বছর ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স প্রদানের প্রমাণ দিতে হবে। ফলে নাগরিকত্বের পথ অনেক ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে উঠেছে।

এদিকে আজ ২৬ মার্চ থেকে যুক্তরাজ্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোর অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বৈধ অভিবাসনের অপব্যবহার রোধে জরুরি পদক্ষেপ সক্রিয় করেছেন।

আজ থেকে আফগানিস্তান, ক্যামেরুন, মিয়ানমার ও সুদান থেকে আসা স্টুডেন্ট ভিসা এবং আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য পাঁচ বছরের স্থায়ীত্বের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সফল আবেদনকারীদের মাত্র ৩০ মাসের অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হবে, যার পর ‘সেফ রিটার্ন রিভিউ’ করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায় কি না তা দেখা হবে।

একই সঙ্গে বিতর্কিত পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে, যেখানে ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থী পরিবারগুলোকে সাত দিনের মধ্যে স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়লে মাথাপিছু ১০ হাজার পাউন্ড (পরিবার প্রতি সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড) দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। তবে এই প্রকল্প নিয়ে লেবার পার্টির অভ্যন্তরেও তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026