মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৪:১৯

বুদ্ধিজীবীরা এখন দলীয়

বুদ্ধিজীবীরা এখন দলীয়

আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: নেতা ও পিতার সন্নিবেশ ঘটিয়ে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে আনা হয়েছে তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা গ্রন্থে। গত রোববার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির উপকণ্ঠে ভার্জিনিয়া রাজ্যের একটি মিলনায়তনে গ্রন্থটির উপর আলোচনায় বক্তারা এমন অভিমত দিয়েছেন।

আইনজীবী তাসনীম আহমেদ শেলীর ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হোস্ট আইনজীবী তাসনীম আহমেদ। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা স্থান পেয়েছে বইটিতে। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগ প্রধান রোকেয়া হায়দার, ভয়েস অব আমেরিকার সাবেক সাংবাদিক এবং ঢাকাস্থ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান টিভির প্রথম মহিলা উপস্থাপিকা মাসুমা খাতুন, গ্রন্থের লেখক শারমিন আহমদের ছোট বোন মাহজাবীন আহমদ মিমি, লেখিকার স্বামী অধ্যাপক ড. আমর খাইরি আব্দাল্লা। বইটির স্বরচিত রিভিউ পাঠ করেন প্রবীণ লেখক ও সাংবাদিক ওয়াহেদ হোসেনী।

তাসনীম আহমেদ বলেন, তার বাবা আইনজীবী জমিরউদ্দিন আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। বঙ্গবন্ধু প্রশাসনে তিনি মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে যখন কর্মরত ছিলেন তিনি দেখেছেন স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার মেধা ও যুক্তির বলে যুদ্ধবিধস্ত- রিজার্ভ শূন্য বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবল করার জন্য কি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

রোকেয়া হায়দার  বলেন, নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার জন্য বইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। মাসুমা খাতুন বলেন, নেতা ও পিতা বইটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তাজউদ্দীন আহমদ বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। তিনি বলেন, “ঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল সংগঠক ও পরিচালক প্রথম প্রধানমন্ত্রী  তাজউদ্দীন আহমদের মূল্যায়ন হয়নি। স্বাধীনতা ও তাজউদ্দীন আহমদ নামটি একসূত্রে গাঁথা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি ও বিস্মৃতিতে তিনি আশা হারিয়ে ফেলছিলেন, কিন্তু এই বই তাকে আবারও আশাবাদী করেছে।

ড. আমর বলেন, তার স্ত্রী নেতা ও পিতা লেখায় দলমতের উর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠভাবে ইতিহাসকে উপস্থাপিত করায় আন্তরিকতার কোন ত্রুটি রাখেনি। এই লেখায় তিনি অজানা এবং ভুলে যাওয়া বীরদের মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের কাহিনীও তুলে ধরেছেন। ওয়াহেদ হোসেনী বলেন, পিতা সম্বন্ধে আলাদাভাবে লেখা যেতে পারে, আবার নেতা সমন্ধে আলাদা ভাবে। কিন্তু নেতা ও পিতার সমন্বয় ঘটানো দুরূহ কাজ। শারমিন আহমদ সেই দুরূহ কাজটি করেছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি ৭০ বছর আগে প্রকাশিত যাযাবরের দৃষ্টিপাত এই অন্যন্য উপন্যাসের একটি   চরিত্রের সঙ্গে  তুলনা করেন। যাযাবর দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মি. সেনের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপের কথা লিখেছেন যেখানে তিনি কখনো স্যার, নিরোদবাবু, খোকা, ওগো ইত্যাদি। কিন্তু ওই ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে সমন্বয় ঘটাননি। নেতা ও পিতা বইটিতে লেখক কঠিন পরিশ্রম ও প্রতিভার জোরে দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন। গ্রন্থটির রচয়িতা শারমিন আহমদ বলেন, সভ্যতার ভিত্তি বস্তু প্রগতি দিয়ে গড়ে ওঠে না। মানবিক, আত্মউন্নয়ন এবং যুক্তি বুদ্ধির চর্চার ভিত্তির ওপরেই গড়ে ওঠে প্রকৃত সভ্যতা। যুক্তি বুদ্ধির চর্চার ওপরে যখন বস্তুগত প্রগতি গড়ে ওঠে তখন সেই জাতির ভিত্তি হয় দৃঢ়।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং  অনেক ক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গ করে সত্যের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ইউরোপের বুদ্ধিজীবী সমাজ রেনেসাঁর সূচনা ঘটান। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক বুদ্ধিজীবীই সত্যের প্রতিনিধিত্ব না করে ভিন্ন ভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ৪১৮ পৃষ্ঠার বইটিকেও একারণে অখণ্ডিতভাবে না দেখে যার যার দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খণ্ডিতভাবে মূল্যায়ন করেছেন বলে মনে করেন লেখিকা ।

শারমিন বলেন, বইটির কিছু অংশ তারা (কথিত আলোচকরা) উল্লেখ করছেন প্রাসঙ্গিক বাকি অংশ বাদ দিয়ে, যা বইটির প্রতি সুবিচার করেনি। যেমন বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ট সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদ এবং হাই কমান্ডকে স্বাধীনতা ঘোষণা না দিয়ে গেলেও তিনি যে বিকল্প মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা ২৫ মার্চ রাত ১২ টার দিকে পাঠান তার বিশদ উল্লেখ বইটিতে রয়েছে। এমনকি ২৫ মার্চ রাতে যে ঐ বার্তা পাঠানো হয়েছিল তার একমাত্র ও জীবিত সাক্ষী বঙ্গবন্ধুর পার্সোনাল এইড বর্ষীয়ান হাজী গোলাম মোরশেদের ১৮ পাতার সাক্ষাৎকারটিও নেতা ও পিতা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

উল্লেখ রয়েছে মেধাবী শহীদ ইঞ্জিনিয়ার নুরুল হকের স্ত্রী ও কন্যার বিশদ সাক্ষাৎকার এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সাক্ষাৎকার। যার মাধ্যমে জানা যায় যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নুরুল হক খুলনা থেকে একটি ট্রান্সমিটার এনেছিলেন। ওই ট্রান্সমিটার দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠানো হয়েছিল সন্দেহে ২৯ মার্চ সকালে পাকিস্তান বাহিনী তার বাসভবন থেকে তাকে চিরতরে তুলে নিয়ে যায়। আলোচনার পর পাঠকদের জন্য  লেখক  অটোগ্রাফ দেন।

অনুষ্ঠানে এমআইটির ছাত্রী সাবরিন আহমেদ ইকবাল প্রযোজিত ও সম্পাদিত তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা গ্রন্থের ওপর একটি স্বল্প দৈর্ঘ তথ্যবহুল ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। উদ্বোধনীতে ভায়োলিন পরিবেশন করেন উইলিয়াম অ্যান্ড মেরী কলেজের ছাত্রী শিল্পা গারগ। ভিডিও পরিচালনা করেন সুজান ইকবাল।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথির মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক ড. রুহুল আমীন, রুবী আমিন, লেখকের মামা সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, মাসুদা আলম, স্থপতি ওয়াজেদা রব ও শহিদুর রব, ভয়েস অফ আমেরিকার সাংবাদিক শেগুপ্তা নাসরিন কুইন, ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী জাহানারা আলী, ইঞ্জিনিয়ার মাজহারুল হক, মধুমিতা চট্টোপাধ্যায়, আরিফা আহমেদ, মারগারেট ডি ওয়াইল্ডসহ মার্কিন আইনজীবী, ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টি ডেমক্র্যাটিক পার্টির বেশ কিছু প্রতিনিধি এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য-কর্মকর্তারা। নিউইয়র্কের মুক্তধারায় বইটি বিক্রি হচ্ছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026