বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৪

লাব্বায়িক ধ্বনিতে কাবার জমিন মুখরিত

লাব্বায়িক ধ্বনিতে কাবার জমিন মুখরিত

শিহাবুজ্জামান কামাল : প্যাঁচটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের এই প্যাঁচটি স্তম্ভ হচ্ছে, শাহাদা, নামাজ, রোজা, হজ্ব এবং জাকাত। আর এই প্যাঁচটি স্তম্ভের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং এগুলো বাস্তবে পালনের মাধ্যমে একজন মানুষ ইসলাম ধর্মে দাখিল হয় এবং মুসলমান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শাহাদা গ্রহণ বা ঈমান আনার পর যে কাজটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে নামাজ। কারণ নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মুসলমান ও অমুসলমানের মধ্যে পার্থক্য করা হয়।

নামাজের পর একজন মুসলমানের জন্য যা অবশ্য করনীয় সে গুলো হচ্ছে, রমজান মাসে রোজা রাখা। মালের জাকাত আদায় এবং হজ্ব আদায় করা। তবে পবিত্র হজ্ব এবং জাকাত আদায়ের ব্যাপারে শর্ত হল; যারা স্বচ্ছল, অর্থ, সম্পদ রয়েছে, তাঁদের জন্য এই ইবাদত অবশ্যকরণীয়। প্রতিবছর জাকাত আদায়ের পাশাপাশি জীবনে একবার হজ্ব আদায় করা তাঁদের জন্য ফরয করা হয়েছে। তাই ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে পবিত্র হজ্ব হছে অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।

তাই যাঁদের সম্পদ আছে, তাঁদের প্রত্যেকে জীবনে অন্তত একবার হলেও হজ্বে যাওয়ার জন্য মনে বাসনা থাকা আবশ্যক।

প্রতি বছরের মত আবার ও আমাদের মাঝে ফিরে এলো পবিত্র হজ্বের মাস। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ইবাদত, বন্দেগীর প্রধান প্রাণ কেন্দ্র পবিত্র মক্কা নগরীতে এখন লক্ষ লক্ষ মুসলমান নরনারীর সমাগম। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভন্ন দেশের মুসলমানরা আল্লাহ্র ঘর পবিত্র কাবা শরীফ তাওয়াফ করছেন। তাঁরা নয়ন ভরে খানায়ে কাবা শরীফ দেখে তাঁদের তাপিত মনকে শীতল করছেন। বারবার আল্লাহ্র ঘর তাওয়াফ করছেন। আল্লাহপাকের দরবারে চোখের পানি ছেড়ে তাঁদের মনের কথা খুলে বলছেন।

ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে এই হজ্ব। পবিত্র এই হজ্ব সম্পাদনের মাধ্যমে বান্দা এবং তাঁর মু্নীবের মধ্যে ইশক এবং মহব্বতের সৃষ্টির সুযোগ ঘটে। বান্দা তার মালিকের সান্নিধ্য লাভের আশায়, তাঁকে একান্ত কাছে পেতে, তার প্রেমে পাগল প্যারা হয়ে, ছুটে চলে যায়, সেই মরুর প্রান্তের পবিত্র মক্কা নগরীর পবিত্র ঘরে।

আরবী শাওয়াল মাস শুরু হওয়ার পর পবিত্র হজ্বের মৌসুম শুরু হয়। আরবী জিলহজ্ব মাসেই পবিত্র হজ্ব অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর আগেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমান নারী-পুরুষ হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা নগরীতে জমায়েত হন। তাঁরা জিলহজ্ব মাসের নির্দিষ্ট সময়ে এহরাম বেঁধে, আল্লাহ্র পবিত্র ঘর তাওয়াফ করেন। আর হজ্ব পালনের মাধ্যমে তাঁরা আল্লাহ্র অনুগত, তাওহিদবাদী এবং তাঁর নেক বান্দায় পরিণত হন। নিজেকে তাঁর সৃষ্টি কর্তার কাছে সোপর্দ করে, তাঁর সন্তুষ্টি হাছিলে তাঁরা সক্ষম হন।

মুসলমানদের ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক দুটি খুশির দিন রয়েছে। যার একটি হচ্ছে মাহে রমযানের পর ঈদুল ফিতর এবং আরেকটি হচ্ছে পবিত্র জিলহজ্ব মাসের পবিত্র ঈদুল আযহা। আর জিলহজ্ব মাসেই মুসলমানদের সেই মহা উৎসব পবিত্র হজ্ব ও কোরবানি অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এবং মহানবী (সাঃ) এর হাদিসের আলোকে জানা যায়, মুসলমানদের এই হজ্ব এবং কোরবানির পিছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

মুসলিম উম্মাহর আদি পিতা নবী ইব্রাহীম (আঃ)এর আল্লাহ্র প্রতি যে দৃঢ় ঈমান ছিল সেই সাথে আল্লাহর জমিনে তাঁর দ্বীন, ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং তাওহীদের দাওয়াত দিতে গিয়ে যে সীমাহীন কষ্ট এবং ঈমানের অগ্নি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ঘটনা রয়েছে সেখানে। আমরা জানি নবী ইব্রাহীম (আঃ)কে বাতিলের মোকাবেলায় একের পর এক ঈমানের অগ্নি পরীক্ষায় তাঁকে দিতে হয়েছিল।

সমস্ত কুফুর ও মুশরিক শক্তির বিরুদ্ধে তাওহীদ ও আল্লাহ্র একত্ববাদের দাওয়াত দিতে গিয়ে তৎকালীন কুফুরি শাসক তাঁকে অগ্নিকুপে ফেলে ছিল। মহান আল্লাহপাক তাঁকে সেখান থেকে রক্ষা করেছিলেন। ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা তাঁর এখানেই শেষ নয়। জাহেলি সেই যুগে তাওহীদের দাওয়াত দিতে গিয়ে তাঁকে সমাজ এবং তাঁর পরিবার ছাড়তে হয়েছিল।

তিনি নিজ দেশ ত্যাগ করে হিজরত করলেন। তাঁর প্রভুর নির্দেশে নিজ শিশু পুত্র হযরত ইসমাইল আঃ) এবং স্ত্রী বিবি হাজেরা(আঃ)কে মক্কার অচিনপুরে জনমানবহীন স্থানে রেখে আসলেন। যেখানে ছিলনা কোন পানি, খাবার বা কোন জনবসতি। সেখানে শিশু ইবরাহিম পানির জন্য ছটফট করছিলেন। বিবি হাজেরা একটু পানির খোঁজে মক্কার সাফা- মারওয়ায় তখন দৌড়াদৌড়ি করছিলেন।

মহান আল্লাহপাকের নিকট বিবি হাজেরার সেই কাজটা বড়ই পছন্দ হয়েছিল। ফলে পরবর্তীকালে আল্লাহপাক গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য বিবি হাজেরার সেই সুন্নতকে হজব্রত মুসলমান নরনারীর জন্য কিয়ামত পর্যন্ত চালু রাখার ব্যবস্থা করে দিলেন। নবী ইব্রাহিম(আঃ)এর ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা এখানে ও শেষ নয়।

এরপর আল্লাহ্র হুকুম পালনে নিজ প্রাণ প্রিয় পুত্র হযরত ইস্মাইল(আঃ)কে আল্লাহ্র রাহে কোরবানি দেয়ার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন মুলত সেটা ছিল আল্লাহপাকের নিকট সব ছেয়ে গ্রহণীয় এবং পছন্দনীয় কাজ। তাই তিনি আল্লাহ্র পরম বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। সেজন্য আল্লাহপাক নবী ইব্রাহিম (আঃ)এর কোরবানির সেই সুন্নতকে বিশ্ব মুসলিম জাতীর জন্য কেয়ামত পর্যন্ত জারি রাখলেন।

নবী ইবরাহিম এবং নবী ইসমায়িল (আঃ) এর হাতে নির্মিত হয়েছিল আল্লাহ্র সেই পবিত্র ঘর। আর সেই নবী ইবরাহিমের (আঃ) বংশধরের উত্তরসূরি হলেন আমাদের শেষ নিবি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ – আঃ)। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ এবং তাঁর অনুসারিরা বিগত পাঁচ হাজার বছর ধরে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহিম (আ;)এর সেই সুন্নতকেই সুশৃঙ্খল প্রন্থায় এযাবৎ এবং প্রতি বছরই পালন করে আসছেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত সেই সুন্নত পালনের ধারা অব্যাহত থাকবে।

তাই প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ আল্লাহ প্রেমিক বান্দারা হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা নগরীতে ছুটে আসেন এবং ধারাবাহিক ভাবে পবিত্র হজ্বের ফরয, ওয়াজিব গুলো সম্পাদন করেন। ১০ জিল হজ্ব তারিখে বিশ্বের প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমান নবী ইবরাহিম (আঃ) এর সুন্নতা হিসেবে পশু কোরবানি করে থাকেন।

পবিত্র মক্কা নগরী হচ্ছে পৃথিবীর সব চেয়ে পবিত্র স্থান। যেখানে আল্লাহ্র ঘর কাবা শরীফ। সেই পবিত্র মাটিতে মহানবী (সাঃ-আঃ) সহ আল্লাহপাকের অগণিত নবী, রাসুল জন্ম গ্রহণ করেছেন। যে দেশে ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আল্লাহপাকের বহু নিদর্শন রয়েছে। তাছাড়া আল্লাহ্র ঘর খানায়ে কাবা, মাকামে ইবরাহিম, পবিত্র হাতিম, ঐতিহাসিক সাফা- মারওয়া পাহাড়, নবীজির বাড়ি। ঐতিহাসিক হেরা, সাওর পর্বত ও আবু কুরাইশ পাহাড়। রয়েছে জান্নাতুল মুয়াল্লা কবর স্থান।

ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান। মিনা, মজদালিফাসহ পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরীফের সেই সমস্ত পবিত্র স্থান। যার পরতে পরতে রয়েছে মহান আল্লাহপাকের অসীম নিদর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য। যা আজো কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। পবিত্র হজব্রত লক্ষ লহ মানুষ আল্লাহপাকের সেই সমস্ত পবিত্র স্থানে গিয়ে জীবনের সমস্ত চাওয়া, পাওয়া, পাপ, অনুতাপ এবং স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র দরবারে হাত তুলে ক্ষমা চান। আল্লাহ্র ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকেন। সেই বিশাল জন্ সমুদ্রের বিস্ময়কর এবং অভূতপূর্ব দৃশ্য বর্ণনা করার মত নয়।

আল্লাহ্র জমিনে তাঁর বিধান কায়েম করতে যুগে যুগে আল্লাহপাক অগণিত নবী, রাসুল পৃথিবীর বুকে প্রেরণ করেছেন। ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে তাঁদেরকে সীমাহীন কষ্ট, ত্যাগ ও কোরবানি দিতে হয়েছিল। তাঁদের ত্যাগ এবং কষ্টের বিনিময়ে পৃথিবীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই আজকেও যদি এই অশান্ত, সংঘাতময় পৃথিবীতে একটু সুখ, শান্তির বাতাস ফিরে আনতে হয়, তাহলে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে নবী ইবরাহিম (আঃ) এর সেই আত্নত্যাগ এবং কোরবানির মহিমায় উজ্জীবিত হতে হবে।

আমাদেরকে ইসলামের ধারক এবং বাহক হতে হবে। ঘরে ঘরে ইসলাম এবং দাওয়াতি দ্বীনের কাজ বাড়াতে হবে। আর একাজের জন্য প্রয়োজনে যান, মাল কোরবানি দেয়ার মন মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। সেই সাথে পবিত্র হজ্বের শিক্ষা অনুযায়ী বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সম্প্রতির বন্ধন আরো সুদৃঢ় করতে হবে।

সেই সাথে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবার আত্নাকে জাগ্রত করতে হবে। চলতি বছর যারা পবিত্র হজ্বে গেলেন, সমস্ত হুজ্জাজে কেরামদের হজ্বকে আল্লাহপাক যেন হজ্বে মাবরুর হিসেবে কবুল করেন। তাছাড়া অতিসম্প্রতি মক্কা শরীফে ক্রেন ধ্বসে যে শতাধিক হাজীদের মৃত্যু হয়েছে, আল্লাহপাক যেন তাঁদেরকে শহীদি মর্যাদা দান করেন। পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে আমার সম্মানিত পাঠক এবং সবার প্রতি রইলো ঈদের শুভেচ্ছা।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026