সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ১২:১৮

গ্রামীণ ব্যাংক ভেঙে দেয়ার সুপারিশ

গ্রামীণ ব্যাংক ভেঙে দেয়ার সুপারিশ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

গ্রামীণ ব্যাংককে কমপক্ষে ১৯ টুকরা করতে চায় সরকার। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আদলে গ্রামীণ ব্যাংককে ছোট ছোট স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় কেবল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে মূলত গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো ভেঙে ফেলারই সুপারিশ করা হয়েছে। শান্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল বিজয়ী এই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কাঠামোর বিষয়ে এমন বিকল্প সুপারিশই করেছে সরকার গঠিত গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন। আর এর অংশ হিসেবে আগামী ২ জুলাই এ নিয়ে রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কর্মশালার মূল বক্তা।

কর্মশালার জন্য যে চিঠি দেওয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ রয়েছে, তিনি ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক উদ্বোধন করেছিলেন। অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংক ভেঙে ফেলার যে আলোচনা, তাতেও তিনি মূল আলোচক। কর্মশালায় কমিশনের পক্ষ থেকে ‘গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কাঠামো: কিছু বিকল্প’ শীর্ষক কার্যপত্র উপস্থাপন করা হবে। সেই কার্যপত্রে মালিকানা বিষয়সংক্রান্ত বিকল্প হিসেবে শিল্প ব্যাংকের আদলে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারি শেয়ারের অংশ ৫১ শতাংশে উন্নীত করে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কমিশনের সুপারিশ করা নতুন কাঠামোতে গ্রামীণ ব্যাংক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, একটি সংবিধিবদ্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই চালু থাকবে। কমিশনের এসব সুপারিশের ওপর আলোচনা করার জন্য বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানসহ অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, এনজিও ব্যক্তিত্ব ও আমলাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

আমন্ত্রণপত্রে সুপারিশসমূহ সংবলিত কমিশনের অবস্থানপত্রও দেওয়া হয়েছে। এই কর্মশালায় মতামত প্রদানের জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কাঠামো পরিবর্তনের সুপারিশসমূহ সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রথম আলোকে বলেন, ‘৮৪ লাখ দরিদ্র নারীর মালিকানাধীন বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি স্বনির্ভর আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সরকারীকরণ করা হলে এটা হবে সরকারের ক্ষমতার চরম অপব্যবহার। আইনি কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংক তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলোর কোনোটাই সামান্যতম বিবেচনারও যোগ্যতা রাখে না।’ ১৯ টুকরা হবে গ্রামীণ ব্যাংক: গ্রামীণ ব্যাংকের মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষত রেখে এর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করেছে কমিশন।

এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবটি হলো, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মতো গ্রামীণ ব্যাংককেও ভেঙে ১৯ বা ততোধিক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা। কমিশন বলছে, এই স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পরের মধ্যে কোনো আইনগত, ব্যবস্থাপনাগত ও আর্থিক যোগাযোগ থাকবে না। এসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্থানীয় সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। আর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মতো গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় শুধু নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া প্রতিটি মাঠপর্যায়ের সংগঠনকে (প্রতিষ্ঠান) নিবন্ধন করার আইনগত কর্তৃত্ব থাকবে। মাঠপর্যায়ের নির্বাচনের সমন্বয়ে থাকবে প্রধান কার্যালয়।

এ ছাড়া সংগঠনসমূহের (প্রতিষ্ঠান) আর্থিক সামর্থ্য ও প্রশাসনিক নিয়োগের বিধিসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা, দেশি-বিদেশি সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয় রাখাই হবে প্রধান কার্যালয়ের কাজ। মালিকানা: গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে সরকারি শেয়ারের অংশ ৫১ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে কমিশন। এ জন্য গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। কমিশন বলেছে, কমপক্ষে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার শেয়ারধারীর সমন্বয়ে গঠিত গ্রামীণ ব্যাংককে একক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আওতায় রাখতে শিল্প ব্যাংকের আইনি কাঠামোর কাছাকাছি আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার (৫১ শতাংশ) থাকবে। বাকি শেয়ার গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের দেওয়া হবে। আর পরিচালনা পর্ষদেও সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংককে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরের পক্ষে যুক্তি দিয়ে কমিশন বলছে, কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য শেয়ারধারীদের নিয়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করা বাধ্যতামূলক। এর পাঁচ লাখ ৪০ হাজার শেয়ারধারীকে নিয়ে এ ধরনের এজিএম আয়োজন করা অকল্পনীয় ও ব্যয়সাপেক্ষ। গ্রামীণ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকারের শেয়ারের অংশ মাত্র ৫ শতাংশ, আর ৯৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক ঋণগ্রহীতা সদস্যরা।

নতুন কাঠামোয় মূল বৈশিষ্ট্য: কমিশনের সুপারিশ করা নতুন কাঠামোতে গ্রামীণ ব্যাংক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, একটি সংবিধিবদ্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই চালু থাকবে। এ ছাড়া এর ছয়টি বৈশিষ্ট্য থাকবে। এগুলো হলো প্রায় পুরোপুরি গ্রামীণ ভূমিহীনদের নিয়ে গঠিত একটি গ্রাহক দল, গ্রাহকদের মুখ্য কেন্দ্রবিন্দু হবেন মহিলারা, নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার থাকলেই পরিচালক নির্বাচনের ভোটাধিকার থাকবে, শেয়ারধারীরাই লভ্যাংশ পাবেন, শেয়ার সরাসরি হস্তান্তর করা যাবে না, শুধু অভিহিত মূল্যে গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করা যাবে এবং গ্রামীণ ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের গ্যারান্টি দেবে সরকার। আর স্বতন্ত্র ১৯ বা ততোধিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদাভাবে পরিচালক নির্বাচন করা হবে। তাই পরিচালকের সংখ্যা ১০০-এর বেশি হতে পারে বলে মনে করে কমিশন। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে এবং কী আইনি ব্যবস্থায় হবে, এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। নতুন কাঠামোয় গ্রামাঞ্চল থেকে সংগৃহীত আমানত ওই এলাকার উৎপাদনশীল কাজে পুনর্বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করবে বলে মনে করে কমিশন।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন কাঠামো কোনো একটি ‘গ্রামীণ ব্যাংক’-এর যদি উদ্বৃত্ত অর্থ ধার দেওয়ার সুযোগ থাকে, তবে বিদ্যমান বাজার ধরে এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে দিতে পারবে। এটা স্থানীয় পরিচালকেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। অন্যান্য: গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ এবং এর পরবর্তী সংশোধনীসমূহের কিছু কিছু অনুচ্ছেদের সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে কমিশনের অবস্থানপত্রে। কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনেও এসব সমস্যার কথা উল্লেখ রয়েছে। কমিশন মনে করে, গ্রামীণ ব্যাংক একটি সংবিধিবদ্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা পুরোপুরি সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এই আইন প্রতিষ্ঠানটির ব্যক্তিগত মালিকানা সমর্থন করে না। এ ছাড়া শেয়ার শব্দটির কোনো ব্যাখ্যা অধ্যাদেশে দেওয়া হয়নি এবং এটা কোনোভাবেই গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর ‘মালিকানা’র দাবি প্রতিষ্ঠা করে না। শেয়ারধারীরা শুধু পরিচালক নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন এমন অধিকারই দেওয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের সদস্য আজমালুল হোসেন কিউসি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূলত কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নেওয়ার জন্যই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। সবার মতামত বিচার-বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে।’ এদিকে, ব্যাংকিং সূত্রগুলো জানায়, দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে করুণ অবস্থার মধ্যে আছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। কোম্পানি গঠন করার পরেও সরকারের নানা ধরনের হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকগুলো চরম সংকটে আছে। দুর্নীতিও এসব প্রতিষ্ঠানে প্রবল। একসময় বেসিক ব্যাংক ভালো হলেও এই সরকারের সময়ে এটিও একটি খারাপ ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত। এই অবস্থায় গ্রামীণ ব্যাংককে পুরোপুরি সরকারি মালিকানা ও পরিচালনায় নেওয়া হলে এই প্রতিষ্ঠানও শঙ্কার মধ্যে পড়ে যাবে। ভারত থেকে ক্ষুদ্রঋণের শিক্ষা!: গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের মডেল এখন সারা বিশ্ব অনুসরণ করছে। অথচ এই ক্ষুদ্রঋণের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন উর রশীদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফরে গেছে। ২৫ জুন পর্যন্ত এই প্রতিনিধিদল ভারতে থেকে গুজরাট রাজ্যের আমুল ও সেবা নামের দুটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কার্যক্রম থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। পরে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা বিবেচনা করবেন। এই প্রতিনিধিদলে কমিশনের সদস্য ছাড়াও গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক রয়েছেন।

এদিকে, চলতি মাসেই কমিশনের গ্রামীণ ব্যাংক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে কমিশন অন্তর্বর্তীকালী প্রতিবেদন দিয়েছে। গত বছরের ১২ মে সাবেক সচিব মামুন উর রশীদকে প্রধান করে গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি ও হিসাববিদ মোসলেউদ্দীন আহমেদ।

সূত্র: প্রথম আলো

 




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2024