মিজানুর রহমান: সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবাদবিরোধী সামরিক জোটে সৈন্য, রসদ ও সরঞ্জামাদি পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ এখনও দোটানায় রয়েছে। যদিও সুন্নি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এমন ভূমিকাই চাইছে রিয়াদ। ঢাকার তরফে অবশ্য বলা হয়েছে, আপাতত গোয়েন্দা তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সর্বাত্মক সমর্থন দেবে বাংলাদেশ।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র মতে, মঙ্গলবার আড়াই ঘণ্টার ঝটিকা সফরে ঢাকা আসা সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইরকে বাংলাদেশের অবস্থান এবং সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ঢাকা এ-ও বলেছে, এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ বা ব্লু হেলমেটের বাইরে কোথাও বাংলাদেশ সৈন্য, রসদ বা সরঞ্জামাদি পাঠায়নি। অতীত বা বর্তমান সব সরকারের আমলে বাংলাদেশ একই নীতি মেনে চলেছে, চলছে। বাংলাদেশ সব ধরনের সন্ত্রাসের নিন্দা করে। এ কুকর্ম পবিত্র ধর্ম বা অন্য যে নামেই হোক না কেন, এটি মোকাবিলায় বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থা দমনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতামূলক বিস্তর কার্যক্রম রয়েছে উল্লেখ করে সৌদি মন্ত্রীকে বলা হয়েছে, রিয়াদ চাইলে দ্বিপক্ষীয়ভাবেও ঢাকা সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার সংক্ষিপ্ত সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এটি ছিল তার সফরের একমাত্র আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি।
সূত্র মতে, প্রায় ৩৩ বছর পর কোনো সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফর করলেন। তা-ও আচমকা। জাকার্তায় গত ৬-৭ই মার্চ ওআইসির একটি অনুষ্ঠানে ছিলেন তিনি। সেখানে অনুষ্ঠানের সাইড লাইনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে তার বৈঠকের আয়োজন ছিল। সেই বৈঠকেই সৌদিমন্ত্রী তার দিল্লি যাত্রা বিরতির কথা জানান। মাহমুদ আলী দিল্লির সঙ্গে ঢাকাকে যুক্ত করার অনুরোধ জানালে তিনি ইতিবাচক সায় দেন।
তবে এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না বলে আগেই অপারগতা প্রকাশ করেন সৌদিমন্ত্রী। তার যাত্রা বিরতির কারণেই মাহমুদ আলী জাকার্তা সফর সংক্ষিপ্ত করে ঢাকায় ফিরেন। সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল সন্ধ্যায় মানবজমিনকে বলেন, অল্প সময়ের নোটিশে হলেও গুরুত্বপূর্ণ ওই সফর আয়োজনে বাংলাদেশের প্রস্তুতির কোনো কমতি ছিল না। সৌদিমন্ত্রীর ব্যস্ততা থাকায় তার সম্মানে পররাষ্ট্র মন্ত্রী আয়োজিত নৈশভোজ শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়েছে। সময় সল্পতার কারণে ঢাকায় দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠকও হয়নি।
দায়িত্বশীল সূত্র মতে, বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে যাওয়ার পথে পুরো সময় এক গাড়িতেই চড়েছেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই সময়ে তাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। মঙ্গলবারের ঢাকা-রিয়াদ ‘কার ডিপ্লোমেসি’তে কী বার্তার আদান-প্রদান হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। ওই দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর বিচারের চূড়ান্ত রায় এবং তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়ে কি না?
জানতে চাইলে সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, গাড়িতে তো নয়ই, সফরের কোনো ফর্মেই এটি আলোচনায় আসেনি। মন্ত্রীদ্বয় দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য অনেক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। যার অনেকটাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় স্থান পেয়েছে। ১৯৮৩ সালের পর কোনো সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ঢাকা সফরে দেশটিতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষা, বাংলাদেশে আরও সৌদি বিনিয়োগ বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং অন্যান্য খাতে সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পেয়েছে বলে জানা গেছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেশটির আন্ডার সেক্রেটারি ড. খালিদ আল জানদান, ড. ইউসুফ আল সাদুন, মহাপরিচালক মোহাম্মদ আল কালাবি, পরিচালক ওসামা নাগলি, পরিচালক খালিদ আল কাঙ্গারি সৌদি এবং ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ এইচ এম আল মুতাইরি সফরের পুরো সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী রিয়াদ যাচ্ছেন: দ্বিপক্ষীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রিয়াদ যাচ্ছেন। আগামী মাসের শেষে তার সফরটি হতে পারে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরে এ নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে জানিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, উভয়ের সুবিধা হয় এমন একটি ‘তারিখ’ চূড়ান্ত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রীর সফরকালে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দাওয়াতপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, চিঠিপত্র এখনও আসেনি। হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই আসবে। সৌদিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় সফরটি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে রিয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকালে নেয়া সিদ্ধান্ত মতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরটি হবে। মে মাসের মধ্যে সফরটি হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে।