আশরাফুল ইসলাম: বিছানায় বাবা কাশেম মিয়ার পাশে বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল চার বছর বয়সী ছেলে ইমরান। বৃহস্পতিবার ভোরে ঘুম ভাঙলে পৈশাচিক বর্বরতায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে কাশেম। ঘরে থাকা ধান কাটার কাস্তে সজোরে চালিয়ে দেয় ঘুমন্ত শিশুপুত্রের গলায়।
জন্মদাতা বাবার বীভৎস নৃশংসতায় শিশুটির গলা কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিথর হয়ে পড়ে কচিদেহ। ঘরের মেঝেতে শিশুপুত্রকে গলা কেটে এভাবে হত্যার পর লাশ গুমের পরিকল্পনা করে কাশেম।
আশ্চর্য নির্লিপ্ততায় ১৫ গজের মতো দূরত্বে একটি নির্মাণাধীন ভবনের মেঝেতে গর্ত খোঁড়ে সে। পরে সেখানে শিশুটির লাশ রেখে মাটিচাপা দেয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজের ঔরসজাত শিশুসন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার এমন অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছে ঘাতক বাবা কাশেম মিয়া। অভাবের কারণে পারিবারিক অশান্তি ও মাদকাসক্তির কারণে সে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে।
শিশুসন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার করে ঘাতক বাবা কাশেম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। গতকাল রোববার বিকালে কিশোরগঞ্জের আমলগ্রহণকারী জিআর আদালত নং-৩-এর বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জগলুল হক তার খাসকামরায় কাশেম মিয়ার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, ঘাতক বাবা কাশেম মিয়া (৩০) পাকুন্দিয়া উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের কুমড়ি গ্রামের আবদুল লতিফ সুলতানের একমাত্র সন্তান। ছয়-সাত বছর আগে পারিবারিকভাবে কাশেম মিয়ার সঙ্গে তাড়াইল উপজেলার গজারিয়া গ্রামের মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়। তাদের দুই সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে তুষামণির বয়স ৫, আর ছোট ছেলে ইমরানের বয়স ৪ বছর। কাশেমের কৃষক বাবা আবদুল লতিফ সুলতান কয়েক বছর আগে পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নেরই জুনাইল গ্রামে বাড়ি করার জন্য কিছু জায়গা ক্রয় করেন। সে জায়গায় একটি পাকাবাড়ি নির্মাণের কাজেও হাত দেন।
কিন্তু কাশেম গাঁজাসহ নানা ধরনের নেশায় আসক্ত হওয়ায় ছেলের নির্যাতনে বাবা আবদুল লতিফ সুলতান জুনাইল গ্রামে বসবাস করার চিন্তা বাদ দেন। এ অবস্থায় বাবার পরিত্যক্ত ভবনের পাশে একটি ঘরে স্ত্রী মরিয়ম আক্তার ও দুই সন্তানকে নিয়ে রিকশাচালক কাশেম বসবাস করে আসছিল। এদিকে কাশেমের মাদকাসক্তি ও সংসারে অভাব-অনটনের কারণে তার সঙ্গে মরিয়ম আক্তারের কলহ লেগে থাকতো। দিন দিন এসব বিষয় নিয়ে মরিয়মের ওপর স্বামী কাশেমের নির্যাতন বেড়েই চলে। পারিবারিক এই কলহের জের ধরে মাস দুয়েক আগে মরিয়ম আক্তার তার মেয়ে সন্তানটিকে সঙ্গে নিয়ে কাজের খোঁজে ঢাকায় চলে যান।
এ সময় তিনি ছেলে ইমরানকে কুমড়ি গ্রামে দাদা আবদুল লতিফ সুলতানের কাছে রেখে যান। গত বুধবার বিকালে কাশেম মিয়া তার বাবার বাড়ি কুমড়ি গ্রামে গিয়ে ঢাকায় মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে শিশুপুত্র ইমরানকে তার সঙ্গে নিয়ে আসে। পরে ওইদিন দিবাগত রাতেই কাশেম মিয়া ঘুমন্ত শিশুপুত্রকে কাস্তে দিয়ে গরুর মতো জবাই করে। পরে শিশুপুত্রের লাশ নির্মাণাধীন ভবনের ভিটির মাটি খুঁড়ে তাতে পুঁতে রাখে। এদিকে নিহত শিশু ইমরানের মা মরিয়ম আক্তার শুক্রবার তার শ্বশুর আবদুল লতিফ সুলতানের নিকট ফোন করে ছেলের খবর জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘ইমরানকে তার বাবা কাশেমের সঙ্গে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’ ইমরানকে নিয়ে কাশেম ঢাকায় আসেনি- মরিয়ম একথা তার শ্বশুর সুলতান মিয়াকে জানালে তিনি জুনাইল গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান।
পরে শনিবার দুপুরের দিকে সুলতান মিয়া ছেলে কাশেমের কাছে গিয়ে নাতি ইমরানের খোঁজ করেন। তখন কাশেম অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকে। এ সময় সুলতান মিয়া বাড়ির এদিক-সেদিক খোঁজ করতে গিয়ে উৎকট গন্ধ পান। এই উৎকট গন্ধের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি তার নির্মাণাধীন পরিত্যক্ত ভবনের ভিটির মাটি খোঁড়া অবস্থায় দেখতে পান।
এতে সুলতান মিয়ার সন্দেহ হলে তিনি গর্তটি খোঁড়ার উদ্যোগ নেন। এ সময় তিনি বালিমাটি কিছুটা সরাতেই ইমরানের মৃতদেহ দেখতে পান। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানতে পেরে ঘাতক কাশেমকে আটক করে থানায় খবর দেয়। পুলিশ ইমরানের মৃতদেহ উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। কাশেমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বাড়ির পাশের একটি পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কাস্তে উদ্ধার করা হয়। পরে কাশেমকে আটক করে পাকুন্দিয়া থানা ও পরে আহুতিয়া তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে যায় পুলিশ।
এ ঘটনায় শিশুটির মা মরিয়ম আক্তার বাদী হয়ে গতকাল রোববার কাশেম মিয়াকে একমাত্র আসামি করে পাকুন্দিয়া থানায় মামলা করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আহুতিয়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই মতিউর রহমান জানান, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজের দোষ স্বীকার করে কাশেম মিয়া আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, সন্তান লালন-পালন নিয়ে সমস্যা, তার শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি কারণে সে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে।
এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত নয় বলে জানিয়েছে কাশেম। সে একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ও গর্ত খুঁড়েছে বলে জবানবন্দিতে বলেছে। এজন্য সে অনুতপ্ত জানিয়ে কান্নাকাটি করেছে।