নাজমুল আহসান: ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির বিকেল। আগের দিনটিই ছিল অসংখ্য বাংলাভাষীর আবেগভরা একটি দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। আর ভারতের আসামের বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ বাংলাভাষী। রাজ্যের সিলচরে ওই দিন হাজির হলেন এক গুজরাটি। সিলচর থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে। গুজরাটের এক নম্বর ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদি পুরো ভারতের এক নম্বর হওয়ার মিশনে নেমেছেন।
লম্বা কুর্তা গায়ে তার। মঞ্চে উঠে হাত নাড়ছেন, মুখে তৃপ্তির হাসি। গলায় ঝুলছে ধূসর বর্ণের পশমি আলখেল্লা। মাথায় সোনালী-সাদা রঙের পাগড়ি। দেখে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীর চেয়েও বিয়ে করতে যাওয়া একজন বয়স্ক বর মনে হবে বেশি। দীপ্ত কদমে এগিয়ে গেলেন তিনি। দরাজ গলায় বক্তৃতা শুরু হলো তার। ক্ষণ কয়েক পরপর তার নামে গলা ফাটাচ্ছে লাখো জনতা।
‘
ভাই-বোনেরা,’ হিন্দিতে বক্তব্য শুরু করলেন মোদি। ‘পুরো আসাম আজ বাংলাদেশীদের জন্য বিপর্যস্ত।’ ততদিনে খবরের কাগজ মারফত জানা যাচ্ছে প্রতিবেশী পাকিস্তানও মোদির উত্থাণ নিয়ে চিন্তিত। সেদিকে ইঙ্গিত করেই তার দম্ভোক্তি: ‘আর আমার কারণে পুরো পাকিস্তান আজ বিপদে।’ ত্রাতা মোদি আসামের জনতাকে প্রস্তাব দিলেন, ‘এবার আপনাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই বাংলাদেশীদের সমস্যা আপনারা সহ্য করবেন, নাকি আসামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন।’
মোদি এরপর আসামের বাংলাদেশীদের দুই ভাগে ফেললেন। বললেন, ‘প্রথম ভাগে যারা আছে, তারা আসলে আসামে এসেছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে। আর অপর ভাগে যারা আছে, তাদের জন্য বাংলাদেশে জীবনধারণ ছিল ভীষণ কঠিন।’ মোদির বক্তব্যে হিন্দু আর মুসলমান ইঙ্গিতটা ধরতে ভুল হবে না কারো। বাংলাদেশে হিন্দুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে Ñ মোদির ক্ষুদ্ধ কণ্ঠ ধ্বনিত হয়ে কানে বাজছে সিলচর মাঠ পেরিয়ে বহুদূর। এরপরই তার প্রশ্ন, ‘এই হিন্দুরা এখন যাবে কোথায়?’ লাখো কণ্ঠের গর্জনসম জবাব: ‘ইন্ডিয়া’। মোদি বলে যাচ্ছেন: হিন্দুরা ছাড়া অন্য যে ‘অনুপ্রবেশকারী’রা আছে, তারা আসামে গেছে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে। তাদের অবশ্যই ফেরত পাঠাতে হবে। এই অনুপ্রবেশকারীরা, মোদির মতে, আসামের তরুণ প্রজন্মের জীবন-জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে। এরপরই ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি: নির্বাচিত হলে, এ রাজ্যের প্রতি সুবিচার করবেন তিনি।
দুই মাস পর, পশ্চিমবঙ্গের আরেকটি জনসভায় মোদির কণ্ঠ আরও ধারালো হয়ে কানে বাজছে। আত্মবিশ্বাসের জেল্লা ফিকরে বের হচ্ছে তার মুখবদন থেকে। মোদির বিজয়ের পদধ্বনি তখন কেবল বধিররাই শুনতে পারছিল না। এমনকি মার্কিন মুল্লুক তার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। উপস্থিত বাঙালিদের মোদি জি প্রতিশ্রুতি দিলেন: ‘আপনারা লিখে নিতে পারেন। ১৬ই মে’র পর, এই বাংলাদেশীদের উচিৎ হবে সব কিছু গুটিয়ে প্রস্তুত থাকা।’
এরপর গঙ্গার পানি আরও শুঁকিয়েছে বাংলাদেশের ওদিকটায়। নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ প্রায় ২ বছর পেরিয়ে গেছে। ক’ জন বাংলাদেশীকে দেশে ফেরত পাঠাতে পেরেছেন মোদি, তার পরিসংখ্যান খুব একটা নেই। কিন্তু আবারও চলে এসেছে নির্বাচন।
এবার আসামের রাজ্য নির্বাচন। সুতরাং, আবারও কামান দাগাতে হবে বিজেপি’র। আর সব পতাকার ঝা-া থাকবে নিঃসন্দেহে মোদি জি’র হাতে। তিনি আবারও গেলেন আসামে। হুঙ্কারে তার কেঁপে উঠলো করিমগঞ্জের মাঠ – ‘বাংলাদেশীদের শুধু ঠেকিয়ে খ্রান্ত হবো না। ঠেঙিয়ে ফেরতও পাঠাবো।’ সৌভাগ্য মোদির। খুব বেশি দিন দেরি নেই পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনেরও। এ বয়সে আলাদা আলাদা কষ্টও করতে হয়নি।