সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৭

রমজানে দান–খয়রাত

রমজানে দান–খয়রাত

শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: রমজান হলো ইবাদতের মাস। ইবাদত দুই প্রকার। শারীরিক ও আর্থিক। রমজানের সঙ্গে উভয় প্রকার ইবাদতের সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। যেমন রোজা পালন ও নামাজ আদায় করা ইত্যাদি শারীরিক ইবাদত এবং জাকাত প্রদান, ফিদইয়া দান এবং কাফফারা ও সদকাতুল ফিতর আর্থিক ইবাদত। অনুরূপভাবে ওমরাহ পালন করা শারীরিক ও আর্থিক ইবাদতের সমন্বয়।

হজ ইসলামের অন্যতম ভিত্তি। রমজানের সঙ্গে হজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। হজ সম্পাদন হয় মক্কা শরিফে; আর মক্কা বিজয় হয়েছিল রমজান মাসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: যারা রমজান মাসে ওমরাহ হজ (নফল হজ) পালন করল, তারা যেন আমার সঙ্গে হজ (ফরজ বড় হজ) আদায় করল। কারণ, রমজানে প্রতিটি আমলের ফজিলত ৭০ গুণ বেশি হয়। আর ৭০টি নফল একটি ফরজের সমান হয়। রোজা যেমন দেখা যায় না বা দেখানো যায় না; তেমনি হজ ও ওমরাহ মানুষকে দেখানোর জন্য যেন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

রমজানের মাহাত্ম্যের আরেকটি হলো ফিদইয়া। রমজানের রোজা একটি শারীরিক ইবাদত। কিন্তু অক্ষম ও দুর্বল ব্যক্তির জন্য এর কাজার পাশাপাশি ফিদইয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা আর্থিক ইবাদত। এতে রোজার পরিধির ব্যাপকতা বোঝা যায়। রমজানের চমত্কারিত্বের অন্যতম হলো কাফফারা।

রোজা শারীরিক ইবাদত হওয়া সত্ত্বেও দুর্বলচিত্তের ব্যক্তি যদি রোজা ভঙ্গ করে; তার জন্য আল্লাহ তাআলা কাফফারার বিধান দিয়েছেন, যার মাধ্যমগুলো হলো দাসমুক্ত করা বা ৬০ জন গরিবকে দুই বেলা তৃপ্তিসহকারে খাওয়ানো অথবা একাধারে ৬০টি রোজা রাখা। যিনি ৩০ দিবসেই রোজা ভাঙেন, তিনি ৬০ দিবস কীভাবে তা পালন করবেন?

মানে আবারও ভাঙলে আবারও প্রতিটি রোজার জন্য দাসমুক্তি বা ৬০ জন মিসকিন খাওয়ানো। মানে হলো দান-খয়রাত সদাকাত তথা গরিবের সেবা ও সমাজের কল্যাণ রমজানের মুখ্য উদ্দেশ্য।

ঈদুল ফিতরের দিন সকালবেলা ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। দাতা ও গ্রহীতার সুবিধার্থে রমজানেও প্রদান করা যায়। এ ঈদের সঙ্গে ফিতরার সম্পৃক্ততার কারণে এর নাম ঈদুল ফিতর।

সদকাতুল ফিতর বা ‘ফিতরা’ হলো ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার উপায়। ধনী-গরিব সবাই যেন ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে, তাই এ ব্যবস্থা। মানুষ সামাজিক জীব, সে অন্যের আনন্দ-বেদনায় প্রভাবিত হয়। তাই এ আনন্দের দিনে পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন যদি আনন্দে শামিল হতে না পারে, তবে আনন্দ পূর্ণতা পাবে না। তাই নিজের আনন্দ সবার মাঝে বিলিয়ে দিতে ও ছড়িয়ে দিতে এ ব্যবস্থা। ফিতরা বা সদকাতুল ফিতর হলো রমজানে রোজা পালনের শোকরিয়াস্বরূপ। এটি রোজার অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেয়। তিনজনের ফিতরা কখনো একটি খাসির মূল্যেরও বেশি হয়। এটি কোনো খয়রাতি ব্যবস্থা নয়; বরং এটি সম্মান ও সম্ভ্রমের প্রতীক।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কল্যাণকামী ও শ্রেষ্ঠ দাতা ছিলেন, আর রমজান এলে তিনি সবচেয়ে বেশি দান করতেন; বিশেষত জিবরাইল (আ.)-এর আগমন হলে তিনি প্রবাহিত বাতাসের মতো দান-খয়রাত করতেন। (মুসলিম: ২৩০৮)।

রমজানের মাসআলা: রোজা রাখতে অক্ষম বা অপারগ হলে রোজার ফিদইয়া প্রদান করা।

কোনো কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমান বার্ধক্য, অসুস্থতা অথবা অন্য যেকোনো কারণে রোজা পালনে অক্ষম বা অপারগ হন। এবং পুনরায় সুস্থ হয়ে বা সক্ষমতা ফিরে পেয়ে রোজার কাজা আদায় করার মতো সম্ভাবনাও যদি তাঁর না থাকে, এমতাবস্থায় এই ব্যক্তির ফিদইয়া আদায় করতে হবে।

ফিদইয়া হলো প্রতিটি রোজার জন্য একটি সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ, যা জাকাত ও সদকার হকদার বা জাকাত প্রদানের খাতে দেওয়া যাবে। এক দিনের ফিদইয়া একাধিক ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করে দেওয়া যাবে আবার একাধিক দিনের ফিদইয়া এক ব্যক্তিকে দেওয়া যাবে। কয়েক দিনের রোজার ফিদইয়া একত্রেও আদায় করা যায় এবং অগ্রিমও প্রদান করা যায়।

যাকে ফিদইয়া দেওয়া হবে, তার রোজাদার হওয়া জরুরি নয়, যেমন: নাবালেগ মিসকিন শিশু বা অতিবৃদ্ধ, দুর্বল, অক্ষম, অসুস্থ ও অসহায় গরিব ব্যক্তি, যিনি নিজেও রোজা পালন করতে পারছেন না। একজনের রোজা আরেকজন রাখতে পারে না, তাই ফিদইয়া রোজার পরিবর্তে রোজা নয়; ফিদইয়া হলো রোজার পরিবর্তে খাদ্য বা উহার মূল্য প্রদান করা (ফাতাওয়া আযিযি)।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026