শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০৩:৩৩

ইউরোপোলের নতুন আইএস রিপোর্টে বাংলাদেশ

ইউরোপোলের নতুন আইএস রিপোর্টে বাংলাদেশ

মিজানুর রহমান খান: নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ইউরোপিয়ান পুলিশ অফিসের (ইউরোপোল) সন্ত্রাসবাদ-বিষয়ক সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে উপমহাদেশ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে, যা উদ্বেগজনক। ২০১৬ সালের এই রিপোর্টে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে জঙ্গি হামলা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। চোখের সামনে ক্রমবর্ধমান হামলার ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ্য করছি। কিন্তু তারপরেও ইউরোপীয় সরকারি প্রতিবেদনে আনুষ্ঠানিকভাবে যখন সম্ভাব্য হামলা বৃদ্ধির বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়, তখন তা আমাদের মধ্যে আরও বেশি ভীতির সঞ্চার করে।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএস ও আল-কায়েদার শাখা তৈরি এবং বাংলাদেশে পশ্চিমাদের টার্গেট করে একাধিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাবলি ওই অঞ্চলগুলোতে ভবিষ্যৎ হামলা ও অপহরণের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি করতে পারে।

ইউরোপোল প্রতিবেদন আরও বলেছে, আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট (একিউআইএস) একজন পাকিস্তানি পণ্ডিত ও তিনজন ব্লগারের (নাস্তিক ও ধর্মদ্রোহী বিবেচনায় দুজন বাংলাদেশি ও একজন পাকিস্তানি) হত্যার দায় স্বীকার করেছে।

ওই প্রতিবেদনে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বাংলাদেশে একজন ইতালীয় নাগরিক এবং ৩ অক্টোবরে একজন জাপানি নাগরিককে হত্যার ঘটনাকে ‘হিট অ্যান্ড রান টেররিস্ট অ্যাটাক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, ‘যার দায় পরে আইএস স্বীকার করেছে’ বলে উল্লেখ করা হয়। আইএস বাংলাদেশের শিয়া সম্প্রদায় ও বাংলাদেশি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আরও আক্রমণ চালানোর দাবিও করেছে।

ওই প্রতিবেদন ছাড়াও মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের পত্রপত্রিকায় যেসব রিপোর্ট ছাপা হচ্ছে, তা থেকে আশঙ্কা করা চলে যে বাংলাদেশি জিহাদিদের সঙ্গে শুধু দক্ষিণ এশিয়াই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জিহাদিদের সঙ্গেও সক্রিয় সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। সুতরাং, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএস ও আল-কায়েদা যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তাকে আমাদের জন্য ঘাড়ের ওপর গরম নিশ্বাস হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে।

আইএসকে এরপরে মিডিয়া অঙ্গনেও বিরাট মাপে মোকাবিলা করতে হতে পারে। ইউরোপোল রিপোর্ট আইএসের ‘সাফল্যজনক প্রপাগান্ডা স্ট্র্যাটেজি’কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। উল্লেখ্য, তারা আর আরবি ও ইংরেজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাদের লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী। তাই তারা টার্গেট দেশে কর্মী ও সমর্থক সংগ্রহ এবং তাদের কাছে মাতৃভাষায় নিজেদের মতাদর্শের বিস্তার ঘটাতে চাইছে। গত ২০ জুন প্রথম তারা ফিলিপাইনে মালয় ভাষায় আল ফাতিহিন প্রকাশ করেছে। দি স্ট্রেইট টাইমস বলেছে, এই পত্রিকা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, দক্ষিণ থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে বিতরণ করা হচ্ছে। মুসলিম জনসংখ্যা-অধ্যুষিত দেশের কর্মী সংগ্রহ অভিযানে তারা বিরাট সাফল্য দেখছে।

আসিয়ান অঞ্চলে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেই সবচেয়ে বেশি বিদেশি যোদ্ধা পেয়েছে তারা। তবে ইউরোপোল রিপোর্ট আরেকটি নতুন সমস্যার দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। সেটি হলো ‘চাইল্ড সোলজারের’ ধারণার বিস্তার ঘটানো। প্রতিবেদনে যেমনটা দাবি বা ইঙ্গিত করা হয়েছে, কিছুটা সত্য হলেও তা বিশ্ববাসীর জন্য একটা মস্ত দুঃসংবাদ বটে। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে সিরিয়া ও ইরাকে বসবাসরত বিদেশি যোদ্ধাদের সন্তানদের ‘পরবর্তী প্রজন্মের যোদ্ধা’ হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একে দেখা হচ্ছে আইএসের ‘রাষ্ট্র গঠনের অনুশীলন’ হিসেবে। তাই সেখানে ‘জিহাদি দম্পতির’ কদর বাড়ছে।

দ্য ইনডিপেনডেন্ট গত ৩০ জুলাই এক রিপোর্টে বলেছে, ধারণা করা হয় যে আইএস-অধিকৃত ভূখণ্ডে অন্তত ৫০ জন ব্রিটিশ শিশু রয়েছে। আইএসের প্রপাগান্ডা ভিডিওতে শিশুদের ব্যবহার ও প্রশিক্ষণরত বিপুলসংখ্যক শিশুর আলোকচিত্রও প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি। মেয়েশিশুদের অস্ত্রবিদ্যার বাইরে রাখা হলেও তারা নাকি ‘জিহাদি জননী’ হিসেবে বেড়ে ওঠার তালিম পাচ্ছে। নেদারল্যান্ডস থেকে সিরিয়া গমনকারীদের শতকরা ৪০ ভাগই নারী।

সতর্কতার সঙ্গে ধারণা করা যায়, বিদেশি যোদ্ধাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলে হয়তো তা বিভিন্ন জরিপ রিপোর্টে কমবেশি প্রকাশ পেত। বাংলাদেশিদের সংখ্যা কত হবে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে বিস্ময়করভাবে গুলশানের হলি আর্টিজানের ‘ও কিচেনে’ নাশকতার পর থেকে বাংলাদেশিদের সপরিবারে সিরিয়া সফর এবং সন্দেহভাজন নিখোঁজ দম্পতির খবর ছাপা হচ্ছে। গত শুক্রবারের প্রথম আলোয় ছাপা হলো বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়া বগুড়ার এ কে এম তাকিউর রহমানের কথা। তিনি

দেড় বছরের কন্যাকে নিয়ে ওমরাহ পালনের কথা বলে স্ত্রীকে নিয়ে দেশ ছাড়েন। তাকিউরের বাবার সন্দেহ তাঁর ছেলে সিরিয়া গেছেন।

ইউরোপোলের ২০১৬ সালের রিপোর্ট আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও সতর্কতা, আরও নিপুণ কৌশল তৈরি ও সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলার উদ্যোগ নেবে, সেটাই প্রত্যাশা।

ইউরোপে আইএস আছে কি নেই, ইউরোপোল কী বলে?

ক. ‘আইএসের সন্ত্রাসী সেল, যা বর্তমানে ইউরোপে সক্রিয় আছে, তা প্রধানত অভ্যন্তরীণ এবং/অথবা স্থানীয়ভিত্তিক।’

খ. অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসীদের মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি রেডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়া থেকে তারা দ্রুত নিয়োগের দিকে ঝুঁকেছে।

গ. টার্গেট শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আইএস মিলিটারি বা পুলিশের মতো কঠিন নিশানা থেকে সফট বা কোমল নিশানা স্থির করাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ, তাতে আঘাত হানাকে তারা

অধিকতর কার্যকর মনে করছে। কারণ, সফট নিশানায় আঘাত হানা হলে তা কঠিন নিশানার চেয়ে বেশি ভীতির সঞ্চার ঘটাতে পারছে।

ঘ. আইএসের প্রশিক্ষণের ধরন ও কাঠামোতে দৃশ্যত প্রতীয়মান হয় যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঘটাতে তাদের কর্মীরা (প্রত্যাগতরাসহ) আবেগকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

এই চারটি বিষয়ের সঙ্গে আমাদের সাম্প্রতিক হামলাগুলোর একটা তুলনা করলে তাতে খুব অমিল আছে বলে তো প্রতীয়মান হয় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ৫ আগস্ট কক্সবাজারে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, সন্ত্রাসীদের কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নেই।…এসব সন্ত্রাসী জেএমবি, হরকাতুল জিহাদের মতো নাম ব্যবহার করছে এবং তারা নিজেদের আইএস সদস্য হিসেবেও দাবি করছে অথচ তারা স্থানীয়ভাবে (হোম-গ্রোন) বেড়ে উঠছে।

বিশ্বব্যাপীও আমরা দেখি, স্থানীয় জঙ্গিদেরকেই আইএস দলে ভেড়াতে টার্গেট করে থাকে। একজন পাকিস্তানি সাংবাদিকের একটি লেখা সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী দৈনিক স্ট্রেইট টাইমসের অনলাইনে পোস্ট করা হয়েছে। এর শিরোনাম ‘হোম-গ্রোন মিলিট্যান্টস ইজি রিক্রুটস ফর আইসিস।’ এতে উল্লেখ আছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান বলেছেন, পাকিস্তানে কোনো আইএস নেই, স্থানীয় জঙ্গিরা আইএসের নাম ব্যবহার করছে।

ওই সাংবাদিক প্রশ্ন রেখেছেন, তাহলে (পাকিস্তান) সরকার কেন প্রত্যাখ্যান করছে? এরপর তাঁর মন্তব্য, অবশ্য অনেকেই আছেন, যাঁরা ইসকাপনকে ইসকাপনই বলতে চান। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইবির বেসামরিক প্রধান প্রকাশ্যে বলেছেন, আইএস পাকিস্তানের জন্য একটি ধেয়ে আসা হুমকি। দুটি শিয়াবিরোধী জঙ্গি সংগঠন আইএসের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

ওই নিবন্ধে বলা হয়, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও শুরু থেকে আইএসের উপস্থিতি অস্বীকার করে আসছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026