মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৬

তথ্য আছে, নখ নেই দাঁত নেই

তথ্য আছে, নখ নেই দাঁত নেই

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মাকসুদুল আলম, টোকিও থেকে: এমপি মানে নাকি এখন আর মেম্বার অফ পার্লামেন্ট নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোস্ট পাওয়ারফুল ব্যক্তি বলেই এখন অধিক পরিচিত। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নিজের খেয়ালখুশি মত যা ইচ্ছে তাই করেন তারা। লোকমুখে শোনা কথা। তবে খুব একটা ভুল শুনেছি বলে মনে হয় না। বাস্তবের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছি অনেক। এমপিদের সবাইকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা যাবে না। তা করাও ঠিক নয়। তবে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই ক্ষমতার দাপটে তালগোল হারিয়ে ফেলেছেন। মোস্ট পাওয়ারফুল ব্যক্তি বনে গেছেন।

একটু স্মরণ করলেই দেখা যায়, তাদের কেউ কেউ নিজের নির্বাচনী এলাকার জনগণের ওপর পিস্তল উঁচিয়েছেন। ঢাকায় সচিবালয়ে এসে সামান্য ফটোকপি করতে দেরি হওয়ায়, আত্মস্বীকৃত খুনি হিসাবে নিজের অতীত কুকান্ড মনে করিয়ে দিয়ে দম্ভ করে প্রয়াত প্রেসিডেন্টের মত গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। রাজধানী ঢাকার মনিপুর স্কুলের অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করতে আসা বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির মহিলা রিপোর্টারের গায়ে হাত তুলেছেন। গালে চড়-থাপ্পর মেরেছেন। টেকনাফের এমপির মারধোর থেকে রেহাই পাননি সেখানকার উপজেলা নির্বাহী অফিসার থেকে শুরু করে উপজেলার শিক্ষক, আইনজীবী, প্রকৌশলীসহ সরকারী ও বেসরকারী কর্মকর্তারা। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এমপিকে দেখে উঠে দাঁড়াননি বলে একজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে কান ধরিয়ে দীর্ঘক্ষণ অফিসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন এই এমপি।

সর্বশেষ আলোচিত সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির পর এবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন একই দলের বরিশাল-২ আসনের আইনপ্রণেতা মনিরুল ইসলাম মনি। মাত্র কয়েকদিন আগেই জাতীয় দৈনিকগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বরিশালের চিফ জুডিশিয়াল আদালতে দৈনন্দিন বিচার কাজ চলাকালীন সময়ে আইনবহির্ভূভাবে আদালত কক্ষে প্রবেশ করে তিনি দায়িত্বরত বিচারকের পরিচয় জানতে চান। দায়িত্বরত বিচারককে এজলাস থেকে নেমে আসতে বলেন তিনি। নিজ হাতে থাকা মুঠোফোনটি বিচারকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, আইনমন্ত্রী আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। স্বভাবতই আদালত কক্ষে একজন আইনপ্রণেতার এ ধরনের কর্মকান্ডে বিব্রত বোধ করেন মাননীয় বিচারক। সেখানে উপস্থিত আইনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ আর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা। মূলত আইনপ্রণেতাদের একেরপর এক বেআইনি কর্মকান্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নিত্যদিনের অতি সাধারণ চিত্র মাত্র। প্রতিনিয়ত চলতে ফিরতে উঠতে বসতে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন তারা। কিছুতেই কাটছে না তাদের ক্ষমতার ঘোর আর মুই কি হনুরে ভাব। শুধু আইন প্রণেতারাই বেপরোয়া নন। রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখেই বলছি।

বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দুদকের মত সরকারের আরেক আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন। সরকারঘেঁষা দৈনিক পত্রিকা সমকালের নির্বাহী সম্পাদক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খানের মতে, এই কমিশন এখন সুকুমার রায়ের বাবুরাম সাপুড়ের নিরীহ প্রাণী। চোখ নেই, দাঁত নেই, কাঁটা নেই এমন কোন সাপের মত। সম্প্রতি নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙ্গার কারণে কোন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের বিধানকে অর্থহীন বলে খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নিজস্ব ক্ষমতাকে খর্ব করার উদ্যোগ নিয়ে নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে তারা। নামসর্বস্ব নতুন একটি অরাজনৈতিক দলকে আগামী নির্বাচনে গমের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অনেক আগেই বিতর্কে জড়িয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। এবার নিজেদেরক ক্ষমতাকে দুর্বল করার অভিযোগ উঠেছে এই কমিশনের বিরুদ্ধে। অজানা কোন এক উপর মহলের অদৃশ্য চাপে তারা প্রার্থিতা বাতিলের বিধানে কর্তৃত্ব হারাতে চায়। সবাই পেতে চায়। আর আমাদের নির্বাচন কমিশন হারাতে চায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করায় নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে সমগ্র জাতি যখন নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়, তখন তারা নিজেরাই নখহীন দন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চায়। আর তা করা হলে নির্বাচনী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলেও প্রার্থীর কোন দায়বদ্ধতা থাকবে না। হবে না কোন সাজা। শুধু তাই নয় সভা সমাবেশে, রাস্তাঘাটে, অলিতে গলিতে মাইকের যথেচ্ছ ব্যবহার, তোরণ নির্মাণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, দেয়াল লিখনে স্বেচ্ছাচারিতা, বাহারি ও রঙিন পোস্টারে পথঘাট ঢেকে ফেলা, যত্রতত্র বিলবোর্ড স্থাপন কোন নিয়মনীতির বালাই থাকবে না। থাকবে না কোন আইনি নিয়ন্ত্রণ। তাহলে কি নির্বাচনকালীন সময়ে দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করতে চায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন? আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও দপ্তরবিহীনমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করেছেন। ইসি সম্পর্কে সংযত হয়ে কথা বলার উপদেশ দিয়েছেন তিনি। নাই কাজ তো খই ভাজ। দেশবাসী ৯ই এপ্রিল মাঝরাতের অর্থ কেলেঙ্কারির কথা ভুলে যায়নি। ভুলে যায়নি গাড়িচালক আলি আজমের কথা। ভুলে যায়নি বস্তায় ভর্তি রেলওয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের কোটি টাকার কথা।

জাতির পিতার দৌহিত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রাজনীতিতে আসছেন নাকি ইতিমধ্যে এসে গেছেন তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এর আগে তিনি যুবলীগের ইফতার মাহফিলে কথার বোমা ফেলেছেন। তার বক্তব্যের পর প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশ্ন রেখেছেন, তিনি কোথা থেকে তথ্য এনেছেন? এই তথ্য হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া কিনা? লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বক্তব্য হাস্যকর। সে পীর হওয়ার আগেই শিন্নি খাওয়া শুরু করেছে। শিন্নি খাচ্ছেন কিনা জানি না। তবে জন্মদিনে তিনি হয়তো মায়ের রান্না পোলাও খেয়েছেন। ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে ছেলের জন্মদিনে রান্নাঘরে কাঠের খুন্তি দিয়ে মাংসের পাতিলে নাড়াচাড়া করতে দেখেছে দেশবাসী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতে, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে মায়ের মতই বাচাল। বংশগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে সে।

এদিকে আগামী নির্বাচনে গমের শীষে (?) ভোট না দিলে বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যাবেনা, রংপুরে মঙ্গা ফিরে আসবে বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। জাতীয় সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা পাপিয়ার দেয়া বক্তব্য অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে বর্তমানে কিছু করেন না। তবে বিদেশে তার মোট ৮/৯ টি বাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তুজার মতে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের উচিত প্রধান বিরোধীদলের আনা এসব অভিযোগের ব্যাখ্যা দেয়া। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের মতে, নির্বাচনী হাওয়া এখন নৌকার পালেই এসে ঠেকেছে। তিনি বলেছেন, সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনের পর বিএনপির মুখে হাসি ফুটেছিল। মনে হয়েছিল যেন আওয়ামী লীগ পানিতে ভেসে গেছে। কিন্তু সেই হাওয়া এখন ঘুরে নৌকার পালেই এসে ঠেকেছে। নির্বাচনী হাওয়া নৌকার পালে দাবি করলেও নিরপেক্ষ কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে রাজি নয় তারা। আর সমস্যাটা মূলত সেখানেই।

লেখক: জাপান প্রবাসী কলাম লেখক




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026