শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১, ১২:১৭

শবে কদর শুধু ২৭ রমজান নয়

শবে কদর শুধু ২৭ রমজান নয়

এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

তামীম রায়হান: আমরা এখন রমজানের শেষ দশক পার করছি। রমজানের সূচনা এবং মধ্যবর্তী সময়ের চেয়ে এ শেষ দশক নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। জমিনবাসী আমাদের কাছেও যেমন তা মহিমান্বিত, তেমনিভাবে ঊর্ধ্বজগতের সর্বত্র এবং পরম দয়াময় আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতেও এ দশক খুব বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কিছু কিছু উদাসীনতা যুগ যুগ ধরে আমাদের মোহগ্রস্ত করে রেখেছে। সেসবের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়- ২৭ রমজানের রাতকে শবে কদর ভেবে অন্য রাতগুলোর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যাওয়া। রমজানের প্রতিটি রাত এবং দিনের সবগুলো মুহূর্ত আল্লাহ পাকের তরফ থেকে আমাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ হাদিয়া। গোটা রমজানের এমন সম্মান ও গুরুত্বের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ মাসেই লুকিয়ে রয়েছে পূণ্যময় রজনী শবে কদর।

কদর শব্দের অর্থ নির্ধারিত পরিমাণ, সম্মানিত এবং ভাগ্য। এ রাতে এক বছরের কার্যসূচি নির্ধারিত হয়, এ রাতের ইবাদত আল্লাহ পাকের কাছে খুব বেশি সম্মানিত এবং সর্বোপরি এ রাতটি অতীব মহিমান্বিত- এসব কারণেই এ রজনীকে লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শবে কদরের ফজিলত কিংবা গুরুত্ব বোঝানোর জন্য পবিত্র কুরআনের একটি সূরাই যথেষ্ট। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ পাক এ রাতের নামে একটি আলাদা সূরা (সূরা কদর) নাজিল করে যে রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ বলে সম্মানিত করেছেন, সেই মহিমান্বিত রাতের বৈশিষ্ট্য বোঝাতে আর কী দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন?

হযরত উবাদা বিন সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসের ভাষা থেকে জানা যায়, আল্লাহ পাক এ রাতের নির্দিষ্ট সময় ও তারিখ জানিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওহি পাঠিয়েছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এ বিষয়টি যখন সাহাবায়ে কেরামকে জানাতে যাবেন, তখনই দু`জন মুসলমানের ঝগড়ার ফলে এ রজনীর বার্তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনোজগত থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। তবে এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেছিলেন, হয়তো এর মধ্যে কোনো কল্যাণ লুকিয়ে রয়েছে। তোমরা রমজানের উনত্রিশ, সাতাশ এবং পঁচিশতম রাতে শবে কদর অনুসন্ধান করো।

বুখারীর বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে প্রতিটি বেজোড় রাতে শবে কদর খুঁজতে থাকো। বুখারী ও মুসলিমের এক হাদীসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাত সম্পর্কে বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় এ রাতে ইবাদতে মগ্ন থাকবে, তার অতীত জীবনের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেওয়া হবে।

বুজুর্গদের বর্ণনা থেকে এ রাতের কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। সেসবের মধ্যে রয়েছে, এ রাত আলোকিত উদ্ভাসিত মনে হবে। তবে বর্তমান আলোকিত শহরে বসবাসকারী মানুষ এ নিদর্শন নাও পেতে পারেন। এ রাতে মানুষের হৃদয় ও মনোজগতে প্রশান্তিভাব বিরাজমান থাকবে। অন্যান্য রজনী থেকে প্রকৃত মুমিন এ রাতে তার মনে স্থিরতা ও মনখোলা উৎফুল্লভাব অনুভব করবে। এ রাতের আবহাওয়া ও বাতাস খুব স্বাভাবিক থাকবে। পরদিন সূর্যোদয়ের সময় সূর্যকে একটু ভিন্নরকম নিষ্প্রভ মনে হবে। প্রকৃত ঈমানদার ইবাদতগুজার ব্যক্তি এ রাতের ইবাদতে অন্য রাতের চেয়ে বেশি তৃপ্তি ও স্বাদ অনুভব করবেন। অনেক সাহাবি এবং আল্লাহওয়ালা বুজুর্গকে স্বপ্নের মাধ্যমেও এ রাতের সংবাদ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এ রাতের ফজিলত লিখে শেষ করার মতো নয়। আসমান থেকে রহমত, কল্যাণ ও মাগফিরাতের ডালি হাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন। ভোর পর্যন্ত সমগ্র ভূমণ্ডলে শান্তি, নিরাপত্তা ও ইবাদতের আবহ ছড়িয়ে দেওয়া হয়।   প্রিয় পাঠক, এ শবে কদর বা কদরের রাতে নির্ধারিত কোনো বিশেষ পদ্ধতির নামাজ অথবা আমল কোনো সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। শবে কদর উপলক্ষে দল বেধে ঘোরাঘুরি কিংবা আড্ডাবাজি এড়িয়ে যতটা সম্ভব সঙ্গোপনে নিজেকে সঁপে দিন পরম দয়াময়ের আশ্রয়ে।

উচিত ছিল, রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাতে সমভাবে ইবাদতে আত্মসমর্পণ করা। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত শেষ তিনটি বেজোড় রাত তথা, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে খুব বেশি ইবাদতমুখী হওয়া উচিত। এ রাতগুলোতে সময় ও সুযোগ থাকলে নিজের পরলোকগত মা-বাবা কিংবা ভাই-বোন-বন্ধু-স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে পারেন। বেশি বেশি জিকির ও তিলাওয়াত করুন। অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজে যতটুকু সম্ভব শুদ্ধভাবে দুআ ও ইবাদতে মনোযোগী হোন। সামর্থ থাকলে গোপনে দান-সদকা করুন।

চারিদিকে রসম-রেওয়াজ ও কৃত্রিমতার ভিড়ে আমরা শুধু ২৭ রমজানের রাতকে গুরুত্ব দিয়ে বাকি রাতগুলো হেলায় কাটিয়ে দিচ্ছি। ২৭ রমজানের একদিন পর ২৯ রমজানের রাত- যে রাতে আমারা অধিকাংশ মুসলমান শপিংমলে ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকি- অথচ হয়তো এ ২৯তম রাতই শবে কদর হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল এবং আমাদের উদাসীনতায় বাজারের হৈ হুল্লোড়ে রাতটি হারিয়ে গেল। তাই, এসবে ভেসে না গিয়ে নিজেদের সাফল্য ও কল্যাণের স্বার্থেই দ্বীনী সচেতনতা ও অকৃত্রিম খোদাভীরুতা আজ খুব বেশি প্রয়োজন।

লেখক- কাতার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, দোহা, কাতার

tamimraihan@yahoo.com

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © 2021 shirshobindu.com