চৌধুরী মুমতাজ আহমদ: হাতে এখন ঘড়ি কেউ খুব একটা পরেন না। সময় জানার প্রয়োজন হলে টুপ করে দেখে নেন হাতে থাকা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। ঘড়ির কাঁটা দেখে সময় জানার দিন ফুরিয়ে গেলেও তারা মাথা তুলে উঁকি দিয়ে তাকান ঘড়িটির দিকে। এটি শুধু একটি ঘড়ি নয়, এটি সিলেটের একটি পরিচয়ও।
সিলেট মানেই আলী আমজাদের ঘড়ি। প্রায় দেড় শ’ বছর ধরে ঘড়িটি দাঁড়িয়ে আছে সুরমার তীরে। যখন সূর্য দেখে, ছায়া মেপে মানুষ সময় গুনতো তখন থেকে সময় জানিয়ে আসছে এ ঘড়ি। আলী আমজাদের ঘড়ি যেন সিলেটের বিগবেন। প্রতারণার শিকার হয়ে এখন থমকে আছে সিলেটের সে বিগবেন।
ঘড়িঘরটির জন্ম ১৮৭৪ সালে, ব্রিটিশ শাসনামলে। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শীর্ষ প্রতিনিধি নর্থ ব্রুক সিলেট আসবেন। ছোট্ট মফস্বল শহরে কি উত্তেজনা। বড়লাটের সিলেট সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে নানাজনের নানা আয়োজন। বড়লাটকে চমকে দিতে মৌলভীবাজারের পৃথ্বিমপাশার জমিদার নবাব আলী আহমদ খান সিদ্ধান্ত নেন একটা ঘড়িঘর তৈরি করে দেবেন সুরমার তীরে।
নৌ বহর থেকে নেমেই যেন বড়লাটের চোখে পড়ে সময়ের কাঁটা। যে কাঁটা জানিয়ে দেবে সরকার বাহাদুরের প্রতি নবাবের একনিষ্ঠ আনুগত্যের কথা। ব্রিটিশ রাজের প্রতি আনুগত্যের স্মারক মাটি থেকে ১৩ ফুট উঁচু এ ঘড়িঘরটি পরিচিতি পায় নবাব আলী আহমদের ছেলে আলী আমজাদের নামে।
সেই থেকে ঘড়িঘরটি সময় জানিয়ে আসছে সিলেটের বাসিন্দাদের। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন ঘড়িটি অচল পড়ে থাকে। আশির দশকে কয়েকজন প্রবাসীর উদ্যোগে প্রাণ পায় আলী আমজাদের ঘড়ি। এরপর থেমে থেমে চলতে থাকে ঘড়ির জীবন।
হঠাৎ সংশ্লিষ্টদের খেয়াল হলে তবেই সংস্কারের ছোঁয়া লাগতো ঘড়িটিতে। সময়ের পথ পরিক্রমায় আধুনিকতার স্পর্শে হাতে-হাতে, মুঠোয়-মুঠোয় সময় জানার যন্ত্র চলে এলেও কী এক ভালোবাসায় পথ চলতি লোকজন উঁকি দিয়ে তাকান আলী আমজাদের ঘড়ির দিকে।
কখনো সঠিক সময় দেখেন, কখনো চোখ আটকে যায় ভুল সময়ে। এভাবেই এখন দিন কাটছে আলী আমজাদের ঘড়ির। সর্বশেষ সংস্কারের পর প্রায় চার বছর ধরে ভুল সময়ে আটকে আছে আলী আমজাদের ঘড়ি। কারো যেন দায় নেই।
২০১১ সালে সর্বশেষ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল ঘড়িঘরের দেখভালের দায়িত্বে থাকা সিলেট সিটি করপোরেশন। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় ঘড়িঘরে বসানো হবে আধুনিক ‘মাইক্রো প্রসেসর বেসড টাওয়ার ক্লক।’ ব্যয় ধরা হয় ত্রিশ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী ২০০৯ সালের ১৭ই জুলাই টেন্ডার আহ্বান করা হয়। জমা পড়ে ৭২টি টেন্ডার। লটারির মাধ্যমে ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ঘড়ি স্থাপনের কাজ পান সিলেট নগরীর মিরাবাজারের বাসিন্দা ঠিকাদার মো. জিল্লুর রহমান।
বাহারি সুবিধা সম্বলিত অতি আধুনিক ‘মাইক্রো প্রসেসর বেসড টাওয়ার ক্লক’ বসাবেন ঘড়িঘরে- এমন শর্তে চুক্তি হয় জিল্লুর রহমানের সাথে। ১ কিলোমিটার দূর থেকে শোনা যাবে ঘড়ির ঘণ্টা। গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টি কোনো কিছু প্রদানেই কার্পণ্য করেননি ঘড়িঘরের কাজ পাওয়া ঠিকাদার। ঘড়ি জমা দেন সিটি করপোরেশনে। স্থাপনের আগে ঘড়ি পরীক্ষা করা হলে বেরিয়ে আসে প্রতারণার গল্প। ‘মাইক্রো প্রসেসর বেসড টাওয়ার ক্লক’-এর পরিবর্তে সরবরাহ করা হয়েছে ‘কম্পিউটার বেসড টাওয়ার ক্লক’। যেটি সুবিধার দিক দিয়ে প্রস্তাবিত ঘড়ির চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এত বড় প্রতারণা করেও পার পেয়ে যান জিল্লুর রহমান। ‘তুকতাক’ দিয়ে সিটি করপোরেশনকে ঠিকই তিনি ঘড়িটি ‘গছিয়ে’ দেন। টাকার অঙ্কে কিছুটা ছাড় দিয়ে বিলও বুঝে নেন তিনি।
তবে ৬ মাস না যেতেই থেমে যায় ঘড়ির কাঁটা। অথচ সিটি করপোরেশনের সরবরাহকৃত তথ্যে জানা যায়, ঘড়ি ‘গছিয়ে’ দেয়ার সময় কথা দেয়া হয়েছিল- একটির পরিবর্তে অন্যটি সরবরাহ করায় যে কোনো মুহূর্তে ঘড়িতে কোনো প্রকার ত্রুটি দেখা দিলে সরবরাহকারী তাৎক্ষণিকভাবে তা বদলে বা সারিয়ে দেবেন। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা স্থায়ীভাবে থেমে যাওয়ার পরও তিনি তা সারিয়ে দেননি। সিটি করপোরেশনও কোনো গরজ করেনি সাড়ে তিন বছর ধরে।