শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:০১

একজন রনির গল্প এবং হাজার রনির কান্নার প্রতিধ্বনি

একজন রনির গল্প এবং হাজার রনির কান্নার প্রতিধ্বনি

মোহাম্মদ এ রহমান: একটু আগে একজনের স্বার্থে কিছু তথ্য যোগাড় করতে ফোন দিয়েছিলাম রনি’কে…

রনি এখন গেটউইক ডিটেনশন সেন্টারে। কাজের যায়গা থেকে রনিকে ধরে নিয়ে গেছে…

রনির সাথে পরিচয় সেই ২০১০/১১ সালের দিকে, আমাদের সেই সময়ের বাসায় থাকা সুমন ভাইয়ের ( আমরা তার পেছনে মেট্র সুমন বলি) পরিচয়ে উঠেছিলো। পড়াশুনা আর তথাকথিত বেআইনী ভাবে কাজে সে প্রচন্ড পরিশ্রম করেছে, শেষবার তার সাথে যখন দেখা হলো মুখটি তার বড় করুন ছিলো, শেষবার যখন কথা হলো জানালো মাসের পর মাস তার এমপ্লয়ার বেতন দেয়না…গত বুধবার সে আটক হয়েছে…

অনেকদিন ভেবেছি এই যে এতো এতো ছাত্র/কর্মজীবি/সুখের সন্ধানী দেশ ছেড়ে আসে এদের জন্য কিছু লিখি/করি কিন্তু পেটের তাড়না আমায় ততোটাই তাড়িত করেছে যতোটা হলে ভালো চিন্তাকে অভাব গিলে খেতে পারে। এই লিখা যারা পড়ছেন তারা হয়তো জানেন, এই সব ছাত্রদের এবিউজকারীগণ বেশীর ভাগ সাদা খ্রিষ্টান নয়, কালো নয়, এরা বাংলাদেশী, পাকিস্তানী, ভারতী, টার্কিশ, শ্রিলঙ্কান। অমানুষিক পরিশ্রম বলতে আপনি যা বুঝেন তা এখানে প্রযোজ্য নয়, যেমন মনে করুন, একটি দেশের ওয়ার্কিং ক্লাস শুধু জানে কাজে আসো, কাজ করো আর বেতন নাও…আপনি দেখবেন এরা এদের মাঝে খুবই নগণ্য একটি সংখ্যা মনে করে এটি তাদের ভাগ্য, বেশীরভাগ অনুধাবনই করতে পারেনা তাদের অবস্থান আর তাদের গন্তব্য কিন্তু যদি দেখেন একটি দেশের কিছু মানুষ মানবিক মর্যাদার সাথে জীবন সংগ্রাম করছে তখন সেখানে আরেক দলকে যখন অমর্যাদা, অসম বেতন আর নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় তখন তারা মানষিক দিক দিয়ে যে তলানীতে এসে ঠেকেন তা তাদেরকে এমন ভাবে রক্তাক্ত করে যার আঘাত দেখা যায়না কিন্তু সে প্রাণ হারায় ধীরে ধীরে, নিশঃব্দে।

এখানে আমি দেখেছি, দুপুরের খাবারে চিপস খেয়ে দিন কাটাতে, রাতের খাবারে যা তা দিয়ে এক রুমে গাদাগাদি করে রাত কাটাতে, বাংলাদেশে যারা বস্তি দেখেছেন বা তাদের নিয়ে কাজ করেছেন তারা হয়তো অনুমান করতে পারবেন যদি বলি এখানে কেউ কেউ থাকেন এমন অবস্থায় যাকে বলা চলে ইউরোপীয়ান বস্তি।

আপনি আমাদের দেশের শ্রমজীবি মানুষের মুখের দিকে যদি তাকান তবে দেখবেন উনাদের চোখে অজানা বা অনির্ণীত এক ভয় বিরাজ করে এখানেও এই মানুষগুলো ইউকেবিএ বা পুলিশের ভয়ে বা কাজ হারানোর এক ভয় হামেশা লালন করেন…এর মানষিক যন্ত্রণা বা প্রভাব কি আপনি জানেন ?

আমি কি বলছি এই দেশের বিরুদ্ধে বলছি, এদের আইন উপরে দিতে বলছি ? না …আমি শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলছি। কোন মানুষের জন্যই তার অর্থনীতিক অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করা অপরাধ নয়, সুখের স্বপ্ন দেখা অন্যায্য নয়…সমস্ত পৃথীবি ট্রেন্ড, ড্যাটা, নাম্বার, ম্যাথ আর প্রেডিকশন, এজাম্পশন এবং গ্যামব্লিং এর উপর চলে আর সে সবের ভীত্তিতেই এদেশীয় বূর্জোয়া সরকার তৃতীয় বিশ্ব থেকে শ্রম দাশ আনে, একেক যুগে একেক নামে। আধুনিক কালের সেই লেভেলটির নাম টায়ার-৪। হাজার হাজার তরুণ, যুবক এই শেকলে বাধা পড়েছেন।

এই গ্যাম্বলিংয়ে সবাই যে হেরেছে এমন নয়…কেউ কেউ বিজয়ী হয়েছেন, কেউ কেউ আবার এমন বিজয়ী হয়েছেন যে এরা শোষীতের দরজা দিয়ে শাষক শ্রেণীর পায়ের পাতায় স্থাণ নিতে পেরেছেন। যাদের কথা বলছি এরা তাদেরই স্বদেশীর থেকে কলেজের নাম করে, ব্যাংকের নাম করে, সার্টফিকেটের নাম করে, কাজ দেয়ার নাম করে, বাসস্থান ম্যানেজের লেভেলে, সমিতীর ব্যানারে, ইনভেস্টমেন্টের মায়ায় ভুলিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে অমানুষিক কষ্টার্জিত হাজার হাজার পাউন্ড।

আমাদের মেয়েদের কথা শুনবেন ? বাসার মালিক, মালিকের ছেলে, পরিচিত ভাইয়া, পরিচিত আঙ্কেল, কলেজের স্যার, স্টেট এজেন্ট, কাজের যায়গার ম্যানেজার, সুপারভাইজার এর হাতে নির্যাতনের কতোশত ঘটনায় দেশে ফেলে আসা পরিবারে হাসি ধরে রেখেছে তার কোন খবর নেই…কখনো যদি এদেশে আসেন তবে রাস্তায়, বাসে, লাইট পোষ্টে, বাস স্টপ আর স্টেশনে দেখবেন লিখা আছে ” বাংলাদেশী হট ম্যাসেজ”

মনে রাখতে হবে অতি অবশ্যই সবাই নয়, বহু ভালো ল’ইয়ার রয়েছেন যাদের গুণে বহু ছেলে মেয়ের হাসি সূদুর দেশে থেকেও দেখা যায়।

পরিতাপের বিষয় এই যে, বাংলাদেশের সরকার এই মানুষগুলোর পাঠানো টাকায় তাদের মেদ বা পাছায় ফ্যাট বাড়াবে কিন্তু এদের জন্য এক পা আগাবে না। কি করতে পারে সরকার এবং এম্বেসী ?

১। সরকার সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কলেজ নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি রাখতে পারে। সেই সকল কলেজে বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনা করতে আসবে যারা গ্যারান্টি দিতে পারবে নিরাপদ এবং নিশ্চিত একাডেমিক ইয়ার। কলেজ গুলো থেকে ছাত্র-ছাত্রীর টিউশন ফিসের বিপরীতে কলেজ কর্তপক্ষ থেকে জামানত রাখার ব্যাবস্থা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে সবচেয়ে বেশী ছাত্র-ছাত্রী হারিয়ে যায় কলেজগুলোর ব্যাবসায়িক এবং অসত লোভের নেশায়।

২। রাষ্ট্র পর্যায়ে আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক বাস্তবতায় পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা ব্যায় লাঘব করতে সীমিত আকারে কাজের ব্যাবস্থার বিধী আনতে প্রচেষ্টা চালানো।

৩। সকল ছাত্র-ছাত্রীকে এম্বেসী থেকে সঠিক ল’ইয়ার নির্বাচনে সহযোগীতা করন। এখানে অনেক ভুয়া অযোগ্য লোক আইনজ্ঞ নাম নিয়ে লুটপাট করছে। এম্বেসী যদি যোগ্য ল’ইয়ার ডিরেক্টরী রাখে তবে বহু ছাত্র-ছাত্রী ধংষ হোয়া থেকে বেচে যাবে। এছাড়াও যখন ছাত্র-ছাত্রীদের হয়রানী কিংবা নির্যাতন করা হয় তখন সঠিক ল’ইয়ার নিয়ে এসবের প্রতিকার কল্পে তারা লড়তে পারবে।

৪। কাউন্সেলিং এর ব্যাবস্থা রাখা যেখানে ক্যারিয়ার, হেলথ, এডুকেশন, ল ইত্যাদি বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীগণ সাহায্য পাবে।

রনি বলছিলো ভাই কোনদিন ভাবিনাই, হাতে হাতকড়া পরবো…কি পাপ করেছি ? আল্লাহ’ই ভালো জানে…কাজ করেছি… দেশে ফিরে গেলে লোক বলবে কিছু করতে পারি নাই, আকামা,আমার সব শেষ…

রনি তোমার আল্লাহকে আরো পুছে নিও তোমাকেই কেন বলি হতে হলো, তোমার বিশ্বাস এখানে অচল, এই পৃথীবি লড়াইয়ের মাঠ, এখানে শক্তিমানেরা বেচে থাকে আর তোমার আল্লাহ বলে সব তার’ই ইচ্ছা…

সব শেষর পর আবার শুরু আর এরই নাম জীবন




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026