প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সমাজসেবায় অনন্য ভূমিকা পালন করে ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ওবিই মারা গেছেন।
গতকাল ভোর ১টা ৩০ মিনিটে তিনি রয়াল লন্ডন হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ১০৬ বছর। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনি যে মানবিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা ইংরেজি ও বাংলাভাষী সমাজে গভীর ছাপ রেখেছে।
মরহুম দবির চৌধুরী ১৯২০ সালের ১ জানুয়ারি এক সময়ের ব্রিটিশ আসামে‑এ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৭ সালে ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করার জন্য ব্রিটেন আসার পর, লন্ডনের বাইরে সেন্ট আলবানসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে কমিউনিটি‑ভিত্তিক কাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হন।
তিনি শুধু সমাজসেবক ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন উঁচুদরের চারণ কবি ও সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী; রচনা করেছেন বহু কবিতা। করোনা মহামারীর কঠিন বছরেগুলোতে তার মানবিক কাজ বিশ্ববাসীর কাছে নতুন করে পরিচিতি পায়।
২০২০ সালের রমজানে রোজা রেখে তিনি তাঁর পূর্ব লন্ডনের বো এলাকার বাসার সামনের বাগানে ৯৭০ লুপ হেঁটেছিলেন, শুধু কিছু অর্থ সংগ্রহের চেষ্টায় নয়, মানুষের দুর্দশা বুঝে তাদের পাশে দাঁড়াতে অন্যকে অনুপ্রাণিত করতে।
এই প্রচেষ্টায় তিনি £৪২০,০০০-এরও বেশি অর্থ তহবিল সংগ্রহ করেন; এর অংশ বিশেষ NHS‑কে দেওয়া হয় এবং বাকিটা দশ টিরও বেশি দেশের দরিদ্র, অসহায় ও দুর্ভোগে থাকা মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় পাঠানো হয়। তাঁর এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ বাঙালি কমিউনিটির মানুষের প্রচেষ্টা একটি গ্লোবাল আন্দোলনে পরিণত হয়।
এই অসাধারণ মানবিক অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে তাঁকে ব্রিটিশ সরকার অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (OBE) দিয়ে ভূষিত করে, যা কমিউনিটির প্রতি তার অম্লান ভালবাসা ও সেবাপ্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি যা করেছি তার প্রশংসা পেয়ে আমি গর্বিত এবং সকলের কাছে কৃতজ্ঞ।
মরহুম দবির চৌধুরী জীবনের কাজের পরিধি শুধুমাত্র তহবিল সংগ্রহে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি নিয়মিত কমিউনিটিতে উৎসাহ এবং সহমর্মিতা ছড়িয়েছেন; মানুষকে এক করে, তাদের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। ১০০ বছরের বেশি বয়সে তিনি বিশ্বমানবিক কর্মসূচি চালিয়ে গেছেন, এমন এক জীবন যিনি শান্তি, দয়া ও সমবেদনার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
তার মৃত্যুতে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, বন্ধু ও বিশাল‑ব্যাপী শুভানুধ্যায়ী সমাজ শোকপ্রকাশ করেছেন। বুকে বয়ে বেড়ানো মানবিকতার দৃঢ়চেতা এই মানুষটির চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তাঁর স্মৃতিচারণায় অনেকে বলেছেন, তাঁর মতো মানুষ এমন ঘন অন্ধকারেও আলো জ্বালাতে জানতো।
Leave a Reply