আর মাত্র ১৭ দিন পর বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সব প্রার্থী এখন যারপরনাই ব্যস্ত প্রচারে। চলছে কথার লড়াই, ভোটারের মনজয়ের চেষ্টা; বইছে প্রতিশ্রুতির বাণ।
একদিকে যখন এমন উৎসবমুখরতা, অন্যদিকে তখন আরেকটি বিষয়ও শঙ্কা জাগাচ্ছে মনে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এমন শঙ্কার বেশকিছু কারণও রয়েছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ভোটারদের ভোট বর্জন করতে বলা হচ্ছে। দলটির পক্ষ থেকে নানা পন্থায় বিভিন্ন মাধ্যমে চালানো হচ্ছে অপপ্রচার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশি-বিদেশি অনেক ষড়যন্ত্রও।
এছাড়া আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে না থাকায় একশ্রেণির ভোটার মনে করছেন, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে না। তাই তারা কেন্দ্রে যেতে এখন পর্যন্ত আগ্রহ বোধ করছেন না, রয়েছেন সিদ্ধান্তহীনতায়।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নিরীহ কর্মী, সমর্থকদের কেউ কেউ হেনস্তার ভয়ে কেন্দ্রমুখী হবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নানা ধরনের ভীতিকর গুজব। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ভোটারদের কেউ কেউ। এ শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের মবসন্ত্রাস।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারও। উপরন্তু ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে সরকারের উদ্যোগও খুব একটা দৃশ্যমান নয়। তদুপরি এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর যতটা সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল, ততটা হয়নি বলে মনে করছেন তারা। ব
লছেন, বিএনপি-জামায়াতসহ ভোটের লড়াইয়ে নামা দলগুলোর প্রচারে ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করার কোনো বার্তা নেই।
শুধু দেশেই নয়, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে বিশ্ব দরবারে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রেও ভোটারের উপস্থিতি হবে একটি বড় মানদণ্ড। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন নিয়ে এ কারণেই দেশে-বিদেশে প্রশ্ন ওঠেছিল, হারিয়েছিল গ্রহণযোগ্যতা। আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন ওই তিনটি নির্বাচনকে বলা হয়ে থাকে বিনা ভোট, রাতের ভোট ও ডামি ভোটের নির্বাচন।
ভোটে অংশগ্রহণকারী দলগুলো অবশ্য মনে করছে, অতীতের তিনটি নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটার উপস্থিতি বাড়বে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোটের পরিবেশ ভালো থাকলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে।
তবে কোনো কারণে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হলে, ভোটারের নিরাপত্তা-ঝুঁকি থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভোটার উপস্থিতিতে। এজন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের কর্মপরিকল্পনাতে ভোটার উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, অপপ্রচার রুখতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে, বাড়াতে হবে সচেতনতামূলক প্রচার।
ভোটারদের ভোটমুখী করতে রাজনৈতিক দলগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ এবং উঠান বৈঠক করার মাধ্যমে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া এবং এসএমএস-এর মাধ্যমে ভোটারদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। গৃহীত পদক্ষেপগুলো সত্ত্বেও ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে চান না; কারণ এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশের অভাব। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে বিএনপির সমপর্যায়ের শক্তিশালী দল মাঠে নেই। জামায়াত চেষ্টা করলেও মুক্তিযুদ্ধে দলটির বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
তাই অনেকে মনে করেন, আসন্ন এ নির্বাচনের ফলাফল একতরফা হবে। এ কারণে ভোটারদের মধ্যে কিছুটা অনীহা রয়েছে। এছাড়া বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে ভোটারদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। তাই ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা কিছুটা হলেও কমেছে।
সেই আস্থা ফেরাতে সরকার ও ইসিকে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। ভোটার যেন তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে-নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। ভোটের দিন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকার ওপর নির্ভর করছে ভোটার উপস্থিতি।
ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ‘ভোটের গাড়ি’ শীর্ষক ক্যাম্পেইন চলছে দেশব্যাপী। প্রতিটি সংসদীয় আসনে যাচ্ছে ভোটের গাড়ি। এ ছাড়া সরকারি সকল মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বিভাগের মাধ্যমে ভোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে সরকারের প্রচারণায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে গণভোট।
অন্যদিকে ইসিও ডিজিটাল প্রচারণায় ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দলটি ফের একটি একতরফা নির্বাচনের শঙ্কা করছে। জাতীয় পার্টিও (জাপা) সরকার ও ইসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
বলেছেন, দেশে নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা হচ্ছে না। দেশে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চলছে। মব লেলিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা হচ্ছে। তাই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আমি আশঙ্কা প্রকাশ করছি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী আমাদের সময়কে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কথাবার্তায় সতর্ক থাকা উচিত। তাদের কথায় যেন ভোটাররা শঙ্কিত না হন। যেহেতু মানুষ অনেক দিন পর একটা ভোটের উৎসব পাচ্ছে, তাতে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে খুব বেশি চিন্তা নেই। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রচারণা বাড়ানো দরকার।
বিএনপিবিহীন ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশগ্রহণ করলেও মাঝপথে তারা ভোট বর্জন করে।
তবে তাদের ৭ জন প্রার্থী বিজয় লাভ করলেও মাত্র ৬ জন শপথ নিয়ে সংসদে যান। সেবার ভোট পড়ে ৮০ দশমিক ০২ শতাংশ। অবশ্য উপস্থিতির এ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে দেশে-বিদেশে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে।
সেবার প্রথমবারের মতো ১৫৩টি আসনে কোনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই পাস করেন প্রার্থীরা। যে ১৪৭টি আসনে ভোট হয়, তাতে ভোট পড়ে ৪০ দশমিক ০৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিএনপি যে নির্বাচনে ছিল না, সেবার ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।
এবার যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ তাই তাদের ভোটে অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। আর দলটি যেহেতু নির্বাচনে নেই এবং তাদের হাইকমান্ড থেকেও ভোট বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছে- ভোটে এর কেমন প্রভাব পড়বে?
এমন প্রশ্নে জেসমিন টুলী বলেন, বড় একটি দল ভোটে না থাকলে এর প্রভাব কিছুটা হলেও পড়ে। যেহেতু তারা ভোটে নেই, তাদের লক্ষ্য থাকবে ভোটটা প্রশ্নবিদ্ধ করা। তাই সরকারের উচিত, সেই ঝুঁকি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজানো। রাজনৈতিক অপপ্রচারের জবাব রাজনৈতিকভাবেই দিতে হবে।
প্রার্থীরা ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সব দলই আওয়ামী লীগের ভোটার-সমর্থকদের টানার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে এখনো আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী, সমর্থকরা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, যা ভোটারদের মাঝে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। এই অবস্থায় দলটির ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন কিনা, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এআই প্রযুক্তি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, এআইয়ের অপপ্রচার রোধ অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
এ জন্য প্রার্থী এবং ভোটারদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। যে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে ফ্যাক্টচেক করার অনুরোধ করেছেন সিইসি। কিন্তু এর পরও অপতথ্য রুখতে পারছে না ইসি।
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম আমাদের সময়কে বলেন, ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে উপস্থিতি নিয়ে চিন্তা নেই। ভোটের পরিবেশ এখন যে রকম আছে, এমন থাকলে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সমস্যা হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ভোটার উপস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ জন্য সরকারের উচিত এই পরিবেশ ধরে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তা করা।
বিশ্লেষকদের মতে, উল্লেখযোগ্য হারে ভোটার উপস্থিতি না থাকলে নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য হওয়া দরকার ভোটারমুখী প্রচারণা বাড়ানো। ভোটারদের অভয় দিতে হবে; ভালো বার্তা দিতে হবে।
Leave a Reply