ব্রিটেনের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত ওয়ার্থিং শহরে এক ব্রিটিশ-পাকিস্তানি কোটিপতি বাড়িওয়ালীর বিলাসবহুল বাড়িতে টানা ১৬ বছর ধরে অমানবিক দাসত্বের শিকার এক নারীর চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
৫৯ বছর বয়সী ফারজানা কাউসার নামের ওই নারী তার বাড়ির এক ভাড়াটেকে রীতিমতো ‘গৃহদাসে’ পরিণত করে ১৬ বছর ধরে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছেন। ভুক্তভোগী নারী এখন পুলিশ হেফাজতে নিরাপদে আছেন।
জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রায় দেড় দশক আগে। ভুক্তভোগী ওই নারী (৬২) শুরুতে ফারজানা কাউসারের মৃত মায়ের বাড়িতে একজন ভাড়াটে হিসেবে বসবাস শুরু করেছিলেন।
কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর ফারজানা কাউসার ওই নারীর ওপর চড়াও হন এবং তার পাসপোর্ট ও ব্যাংক কার্ড কেড়ে নেন। এরপর থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী নরকবাস। ওই নারীকে কোনো বেতন ছাড়াই বাড়ির যাবতীয় কাজ, রান্না এবং কাউসারের ১০ সন্তানকে লালন-পালন করতে বাধ্য করা হতো।
তদন্তে জানা গেছে, ফারজানা কাউসার অত্যন্ত সুকৌশলে ওই নারীকে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন। তিনি নিজেকে ওই নারীর ‘কেয়ারার’ বা সেবিকা হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও তাকে চোখে চোখে রাখতেন।
শুধু তাই নয়, কাউসার ভুক্তভোগীর নামে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সরকারি ভাতার টাকা নিজের পকেটে ভরেছেন। এমনকি নিজের বিলাসবহুল গাড়িগুলোর রোড ট্যাক্স ফাঁকি দিতে তিনি ওই নারীর নাম ব্যবহার করে প্রতিবন্ধী কোটার সুযোগ নিতেন।
২০১৯ সালে প্রথম পুলিশের নজরে আসে বিষয়টি। কিন্তু চতুর কাউসার বিচার বাধাগ্রস্ত করতে ভুক্তভোগীকে লন্ডনের ইলফোর্ড এলাকার একটি ছোট স্যাঁতসেঁতে কক্ষে লুকিয়ে রাখেন এবং তাকে দিয়ে জোরপূর্বক একটি চিঠি লেখান যে, তিনি স্বেচ্ছায় সেখানে আছেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।
ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতায় ওই নারীকে উদ্ধার করা হয়। আদালতের রায়ে বিচারক কাউসারকে ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
লুইস ক্রাউন কোর্ট এই মামলার রায় ঘোষণার সময় কাউসারের বিশাল সম্পত্তি থেকে ভুক্তভোগীকে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৬ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। এই অর্থ আদায়ের জন্য কাউসারকে তার সম্পদের একটি বড় অংশ বিক্রি করতে হয়েছে।
বর্তমানে ভুক্তভোগী নারী সরকারি হেফাজতে নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের ট্রমা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। এই ঘটনাটি ব্রিটেনে দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা আধুনিক দাসত্বের এক ভয়াবহ চিত্র হিসেবে সামনে এসেছে।
Leave a Reply