যুক্তরাজ্যে বাংলা মিডিয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন আজ রোববার ২৫শে জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এ নিয়ে অনেকটা উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করছে বিলেতের বাংলা মিডিয়ায়। দুই বছর পর আবারও এই নির্বাচনকে ঘিরে মিডিয়াপাড়ায় শুরু হয়েছে এক বিশাল আনন্দযজ্ঞ।
দু’টি প্যানেলে মোট ১৫ টি পদে ৩০ জন ও স্বতন্ত্র হিসেবে একজন সহ মোট ৩১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
গত কয়েক সপ্তাহ তারেক-আকরাম-শাহনাজ এলায়েন্স ও সায়েম-সালেহ-হান্নান টিম দলবেঁধে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজগুলোতে নিজেদের পক্ষে ভোট নিয়ে আসতে জোর তদবির চালিয়েছেন। সহ-সভাপতি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী আহাদ চৌধুরী বাবুও সাধ্যমত চেষ্টা-তদবির চালিয়েছেন সকল ভোটারদের সাথে।
গত কয়েক সপ্তাহ প্রার্থী ও প্রার্থীর সমর্থকরা ধরনা দিয়েছেন ভোটারদের কাছে মোবাইল ফোন, হোয়াটস্আপ অথবা ফেসবুকের মাধ্যমে। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের নির্বাচন নিয়ে বাঙালী কমিউনিটিতেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
এবারের লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব নির্বাচনে নিজের অথবা নিজের এ্যালায়েন্সের ভোট নিশ্চিত করতে ব্যতিক্রমী প্রচার-প্রচারনাও চালিয়েছেন অনেকেই। দিনকে রাত আর রাতকে দিন করে ভোটারদের মন জয় করতে ইংরেজ ভূখন্ডের এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটে বেড়িয়েছেন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের প্রার্থীরা।
ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এই সুন্দর প্রচারনার মাঝেও একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে চোখে লাগছে, যা প্রেসক্লাবের নীতিমালার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিছু প্রার্থীর পক্ষে নন-মেম্বার, অর্থাৎ কমিউনিটির পরিচিত লোকজন ফোন করে ভোট চেয়েছেন, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে পোস্ট দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। এমন অভিযোগ করেছেন ভোট কেন্দ্র আসা ভোটাররা।
শুধু তাই নয় কেউ কেউ আবার ‘কী’ পোষ্টে যারা দাড়িয়েছেন তাদের ব্যাপারে নেগেটিভ কথা বলছেন যা সত্যিই দুঃখজনক। এতে ক্লাবের স্পিরিট ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে সচেতন ভোটাররা মনে করছেন। যেহেতু এটা সাংবাদিকদের ক্লাব সেক্ষেত্রে এখানে যারাই আছেন তারা প্রত্যেকেই সচেতন এবং নিজের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে কেউ যদি বিদ্বেষমূলক কথা বলেন সেক্ষেত্রে অপর প্রার্থীর বরং ক্ষতির চেয়ে লাভ হবার সম্ভাবনাই বেশী। কাউকে ছোট নয় বরং সমান করে দেখা এবং যোগ্যতা বিচার করাই হবে আসল কাজ।
এবার দু’টি প্যানেলেই সভাপতি পদে দুই চৌধুরীর খেলা অনেকটা জমে উঠেছে। ভোট দিয়ে ফিরে আসা অনেক ভোটারের সাথে শীর্ষবিন্দু নিউজের প্রতিনিধি আলাপকালে জানতে পারেন, সভাপতি পদপ্রার্থী দুই চৌধুরীর অবস্থার সমানে সমান থাকলেও ক্লাবের বর্তমান সিনিয়র সহ সভাপতি ও উইকলি বাংলা পোষ্টের এডিটর ব্যারিষ্টার তারেক চৌধুরী অন্য প্রার্থী এটিএন বাংলা ইউকে’র নিউজ এডিটর সাঈম চৌধুরী থেকে এগিয়ে আছেন।
তারা দুজনেই সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবারই প্রথম। ক্লাবে তাদের দু’জনেরই ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে ব্যারিষ্টার হিসেবে ক্লাবের বিভিন্ন সদস্যদের আইনী পরামর্শ দিয়ে সহায়তা, স্যোশাল মিডিয়ায় উপস্থিতি ও ক্লাবের হোয়াটসআপ গ্রুপে নিয়মিত আপডেট ও সাধারণ সদস্যদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ মেইনটেইনের কারনে তারেক চৌধুরী অনেকটা এগিয়ে আছেন বলে মনে হচ্ছে।
সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইউকে বাংলা লাইভ এর এডিটর আকরামুল হোসাইন ও উইকলি বাংলা পোষ্টের সাব এডিটর সালেহ আহমেদ। সদস্যদের মাঝে দারুন জনপ্রিয় সালেহ আহমেদ। সবার সাথে সমানতালে যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রে তিনি এগিয়ে। এছাড়া এখন পর্যন্ত প্রেসক্লাবের কোন নির্বাচনে তিনি পরাজিত হননি।
তবে আকরামুল হোসাইনও কম যান না। ইয়াং এনার্জেটিক আকরাম ক্লাব অন্ত:প্রাণ। প্রথমবার নির্বাচন করেই অর্গানাইজিং এন্ড ট্রেনিং সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
বিশেষ করে ক্লাবের ফান্ড রেইজ করতে সবচেয়ে বেশী অর্থ সংগ্রহ করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া ক্লাবের সেক্রেটারি হিসেবে যোগ্যতার বিচারেও তিনি এগিয়ে আছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। তবে ভোট ফেরত ভোটারদের মতে, সালেহ আহমদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ধরে রাখার সম্ভাবনা বেশী।
ট্রেজারার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন টু এ নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও জনপ্রিয় সাংবাদিক আব্দুল হান্নান ও নারী এশিয়ান ম্যাগাজিনের এডিটর শাহনাজ সুলতানা। সাধারণ সদস্যদের সাথে কানেকশন ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে হেল্পের কারনে এবং বিগত দুই টার্মে সফলতার কারণে আব্দুল হান্নান ট্রেজারার পদে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তবে তার আতংকের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেন বেশ কয়েকজন সাবেক সভাপতি সেক্রেটারি শাহনাজ সুলতানার পক্ষে অবস্থান করায়। এছাড়া মিষ্টভাষী এবং একজন মহিলা এই প্রথম এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে দাড়ানোয় ভোটার খুবই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন বলে ভোট ফেরত ভোটাররা জানান এই প্রতিবেদককে। যদি শেষ মুহূর্তে কিছু একটা ঘটে তবে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।
সিনিয়র সহ সভাপতি পদে দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও বর্তমান সেক্রেটারী তাইসির মাহমুদ ও কিউ নিউজের ফাউন্ডার আব্দুল কাইয়ুম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দু’জনই ক্লাবে বেশ জনপ্রিয়। তবে বিগত দুই বছরে ক্লাব সদস্যদের জন্য এওয়ার্ড, সদস্য সন্ধ্যা আয়োজনসহ বেশ কিছু ভিন্নধর্মী কাজের জন্য তাইসির মাহমুদ অনেকটা এগিয়ে আছেন বলে জানান ভোটাররা।
সহ-সভাপতি পদে এবার ত্রিমাত্রা যোগ হয়েছে একই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশ গ্রহণ। এ পদে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন আহাদ চৌধুরী বাবু। তার বিপক্ষে লড়ছেন বর্তমান এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি, চ্যানেল এস এর সিনিয়র রিপোর্টার রেজাউল করীম মৃধা ও এটিএন বাংলার নিউজ প্রেজেন্টার সালাহ উদ্দিন শাহীন। সে হিসেবে আহাদ চৌধুরী বাবু ৩০টি ভোট পিছনে রেখে শুরু করছের তারা যাত্রা। বিগত কয়েক টার্মের ধারাবাহিক সাফল্য, ক্লাবের জন্য ডেডিকেশন সবকিছু মিলিয়ে এখানে রেজাউল করীম মৃধার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশী। তবে এক্ষেত্রে আহাদ চৌধুরী বাবু ভোটারদের সাথে ব্যাক্তিগত যোগাযোগ ও সম্পর্ক একেবারে এড়িয়ে যাবার মতো হয়। শেষ মুহুর্তে তিনিও চমক দেখাতে পারেন।
এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পদে লন্ডন বাংলা ভয়েসের এডিটর জাকির হোসাইন কয়েস ও আইওন টিভির চীফ রিপোর্টার আব্দুল কাদির মুরাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ক্লাবের সবচেয়ে বেশী প্রেসকনফারেন্সে অংশ নিয়ে পুরস্কার জেতা জাকির হোসেন কয়েসই এখানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। যদিও আব্দুল কাদির মুরাদ গত নির্বাচনে অপর প্যানেল থেকে নির্বাচন করলেও এবার তিনি ‘লাক’ পরীক্ষা করতে প্যানেল পরিবর্তন করেছেন। তার সেই লাক পরীক্ষা কাজে দেয় কি না তা জানা যাবে কয়েক ঘন্টা পরে।
এসিস্ট্যান্ট ট্রেজারার পদে প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান এসিস্ট্যান্ট ট্রেজারার, চ্যানেল এস এর সাবেক জনপ্রিয় সিনিয়র রিপোর্টার ও আইকে নিউজের ফাউন্ডার ইব্রাহিম খলিল ও ফ্রি ল্যান্স প্রেস ফটোগ্রাফার এখলাসুর রহমান পাক্কু। দু’জনই ইয়াং এনার্জেটিক। তবে গত তিন টার্মে ধারাবাহিক সাফল্যের কারনে ইব্রাহিম খলিল অনেক এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে গত নির্বাচনে মোটামুটি ভাল ফলাফল করেও অকৃতকার্য হওয়া পাক্কু একেবারে কম যান না। এবার দেখিয়ে দিতে পারে অনেকটা মিরাকল ফলাফল।
অর্গানাইজিং এন্ড ট্রেনিং সেক্রেটারী পদে ইকরা বাংলা টিভির হেড অব নিউজ আলাউর শাহীন ও এটিএন বাংলার ভিডিও এডিটর আফজাল হোসেন। শেষ মুহুর্তে ভোটারদের মন জয় করতে দু’জনই ভীষন ব্যস্ত। এখন দেখার পালা শেষ হাসি কে হাসেন। সহকর্মীদের কাছে দুজনেই সমান জনপ্রিয়।
মিডিয়া এন্ড ফ্যাসিলিটি সেক্রেটারি হিসেবে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন- ক্লাবের বর্তমান ইসি মেম্বার, চ্যানেল এস এর স্টাফ রিপোর্টার ফয়সল মাহমুদ ও টিভি ওয়ানের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর আব্দুস সাত্তার মিশু। তাদের অমায়িক ব্যবহার সবার নজর কারে। তবে বর্তমান ইসি মেম্বার হিসেবে ক্লাবের সব অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণ, লাইফ মেম্বারের মাধ্যমে ক্লাবের ফান্ড গঠন, ক্লাব সদস্যদের সাথে যোগাযোগ ও একজন ফুলটাইম সাংবাদিক হিসেবে ফয়সল মাহমুদ অনেক এগিয়ে রয়েছেন। তবে আইটি সেক্টরের জ্ঞানের দিকে থেকে এগিয়ে আব্দুস সাত্তার মিশু নতুন কিছু এবার দেখাতে পারেন।
ইভেন্ট এন্ড ফ্যাসিলিটিজ সেক্রেটারী হিসেবে রয়েছেন- বর্তমান ইভেন্ট সেক্রেটারি, চ্যানেল এস এর বার্তা সম্পাদক রুপী আমিন ও উইকলি বাংলা সংলাপের লন্ডন প্রতিনিধি আনিসুর রহমান আনিস। এক্ষেত্রে গত টার্মের ব্যাপক সফলতার কারনে রুপী আমিনের বিজয় অনকটা নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে।
এছাড়া কার্যনির্বাহী সদস্য পদে মোট ১০ জন প্রার্থী রয়েছেন। তারেক-আকরাম-শাহনাজ এলায়েন্সের পক্ষে লড়ছেন শাহীদুর রহমান সুহেল, সাজু আহমেদ, এনামুল হক চৌধুরী, হাসনাত চৌধুরী ও মোহাম্মদ আবু তালেব।
আর সায়েম-সালেহ-হান্নান টিমের পক্ষে সারোয়ার হোসেন, লোকমান হোসেন কাজী, ফারজানা চৌধুরী, সৈয়দ রুম্মান ও ফজলে রহমান পিনাক। এর মধ্যে পাঁচজনকে সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করতে পারবেন।
এই ১০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটে বিজয়ী, প্রথম সদস্য সাহিদুর রহমান সুহেল, সারওয়ার হোসেন, এনাম চৌধুরীর বিজয় অনেকটা নিশ্চিত। বাকী দু’টি পদে সাজু আহমেদ ও হাসনাত চৌধুরীর অবস্থান এগিয়ে রয়েছে বলে জানান ভোট ফেরত ভোটাররা।
আজ রবিবার ২৫শে জানুয়ারি সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় পূর্ব লন্ডনের ইম্প্রেশন ভেন্যূতে বসেছে বিলেতের সাংবাদিক-লেখক ও কমিউনিটি ব্যাক্তিদের এক মহামিলন। কমিউনিটির বিভিন্ন পেশার গন্যমাণ্য ব্যাক্তিদের দেখা গেছে এই মিলন মেলায়।
শেষ মুহুর্তে ভোটারদের মন জয় করতে আজ সারাদিন সকল প্রার্থী ভীষন ব্যস্ত ছিলেন। সন্ধ্যা ৬টায় ভোট প্রদান শেষ হওয়ার পর এখন চলছে ভোট গনণা। কয়েকঘন্টা মধ্যে জানা যাবে সেই কাংকিত ফলাফল।
Leave a Reply